News

স্কুল ফিডিং/চরাঞ্চলে প্রাথমিকে বাড়ছে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, নারীদের মিলছে কর্মসংস্থান

তিস্তা, ধরলা আর সানিয়াজান নদীবেষ্টিত লালমনিরহাটের দুর্গম চরাঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এখন বইয়ের পাতার আলোর পাশাপাশি ছড়াচ্ছে পুষ্টির সুবাস। একসময় যে কোমলমতি শিশুরা ক্ষুধা ও পুষ্টিহীনতার কারণে নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসতে চাইত না, অনেকে ঝরে পড়ত। সরকারি ‘স্কুল ফিডিং’ কার্যক্রমের ছোঁয়ায় তাদের মুখে এখন হাসির ঝিলিক। ‘স্কুল ফিডিং’ শুধু শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ায়নি, গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থান ও শিশুস্বাস্থ্যের আমূল পরিবর্তনে এই পাইলট প্রকল্পটি চরাঞ্চলে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করেছে।

জানা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়া রোধ এবং আগামী প্রজন্মের পুষ্টিহীনতা দূর করতে সরকারের উদ্যোগে পাইলট প্রকল্প হিসেবে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম ও কালীগঞ্জ উপজেলার ৩১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর থেকে চালু হয় ‘স্কুল ফিডিং’ কার্যক্রম। প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি শিশু প্রতিদিন ক্লাসের ফাঁকে টিফিনে পাচ্ছে উন্নতমানের সুস্বাদু খাবার। সাপ্তাহিক রুটিন অনুযায়ী প্রতিদিন সরবরাহ করা হচ্ছে স্বয়ংক্রিয় মেশিনে প্রস্তুত করা পুষ্টিকর বনরুটি। এর সঙ্গে সপ্তাহে একদিন প্যাকেটজাত তরল দুধ (২০০ মিলি) এবং একদিন কলা দেওয়া হয়। বাকি তিন দিন বনরুটির সাথে থাকে একটি করে সিদ্ধ ডিম। সরকারি লোগোযুক্ত এ খাবার পেয়ে দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে অবস্থান করার শক্তি পাচ্ছে শিশুরা, যা তাদের মেধাবিকাশ ও শারীরিক বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, পাটগ্রাম উপজেলায় ২২ হাজার ৮২৯ জন এবং কালীগঞ্জ উপজেলায় ১৯ হাজার ৮৫০ জন শিশু শিক্ষার্থী নিয়মিত এই টিফিন পাচ্ছে। নদীবেষ্টিত এসব এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে আগে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ৭০ শতাংশের আশপাশে থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫ থেকে ৯৭ শতাংশে। অনেক বিদ্যালয়ে ঝরে পড়ার হার নেমে এসেছে একেবারে শূন্যের কোটায়।

ভোটমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আসাদুজ্জামান দুলু বলেন, নদী পার হয়ে আসা চরের শিশুরা দুপুর গড়ালে ক্লান্ত হয়ে পড়ত এবং পড়াশোনায় মনোযোগ হারাতে পারত না। এখন পুষ্টিকর টিফিনের সুবাদে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি যেমন আকাশচুম্বী, তেমনি তাদের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে মুখর হয়ে উঠেছে শ্রেণিকক্ষ।

অভিভাবক আজিজার রহমান ও মঞ্জুম আলী বলেন, আগে শিশুরা স্কুল যেতে চাইত না। খাবার পেয়ে এখন নিয়মিত স্কুলে যায়। আমরা গরিব মানুষ বাচ্চাদের টিফিনের জন্য প্রতিদিন খাবার বা টাকা দিতে পারি না। সকালে যা পায় তা খেয়ে স্কুলে গিয়ে সারাদিন থাকা শিশুদের জন্য কষ্টকরও বটে। তাই এ কার্যক্রম সারাদেশে সচল রাখার আহ্বান জানান তারা।

একই সুর মদনপুর বৈরাতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হেশনে হাসিন কিংবদন্তি ও তাসলিমা ইয়াসমিন হুমায়রার কণ্ঠেও। তারা বলে, আগে খিদার চোটে ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখা কষ্টকর ছিল। এখন নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার পেয়ে আমরা খুব আনন্দিত এবং পড়ালেখায় পূর্ণ শক্তি পাচ্ছি।

এই প্রকল্পের আরেকটি বড় ইতিবাচক দিক হলো নারীর ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থান। প্রতিটি বিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকার নারীদের মাধ্যমে প্রতিদিনের সিদ্ধ ডিম ও কলা সরবরাহ করা হচ্ছে। বাস্তবায়নকারী বেসরকারি সংস্থা ইএসডিওর তত্ত্বাবধানে এই নারীরা উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠছেন। সংস্থাটির জেলা ম্যানেজার বাবুল আক্তার জামান জানান, স্থানীয় নারীদের সম্পৃক্ত করায় তারা প্রতি সপ্তাহে বিল পেয়ে মাস শেষে চার-পাঁচ হাজার টাকা আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন, যা তাদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা এনে দিচ্ছে। অন্যদিকে, হাতীবান্ধা উপজেলার আল মদিনা বেকারিতে বনরুটি প্রস্তুত এবং দরপত্রের মাধ্যমে এনজিও ‘আরডিএ’র মাধ্যমে দুধ সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে তদারকি করা হচ্ছে।

লালমনিরহাট জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আহসান হাবিব বলেন, আগে এ দুই উপজেলার বিদ্যালয়গুলোতে উপস্থিতি ছিল ৭০ শতাংশ। এখন স্কুলফিডিংয়ের খাবার পেয়ে তা বেড়ে ৯০/৯৫ শতাংশ হয়েছে। উপস্থিতির সঙ্গে বেড়েছে শিক্ষার মান ও শিশুদের পুষ্টি। ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে। পাইলট এ প্রকল্পটি সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়া দরকার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

source: Asia Post

Back to top button