ভারত কোনো ‘ব্যানানা রিপাবলিক’ নয়— কংগ্রেসের সমালোচনায় বিজেপি

ভারত কোনো ‘ব্যানানা রিপাবলিক’ নয় বলে মন্তব্য করেছেন ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মুখপাত্র রবি শঙ্কর প্রসাদ। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে বিরোধীদের বিক্ষোভ এবং ধরপাকড়ের ঘটনায় কংগ্রেস ও বিরোধী জোটের সমালোচনা করে তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারত কখনো মাথা নত করেনি, করবেও না। তার দাবি, ভারতের গণতন্ত্র রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে।
‘ব্যানানা রিপাবলিক’ বলতে সাধারণত এমন রাষ্ট্রকে বোঝানো হয়, যেখানে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্বল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাবশালী ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা বিদেশি বাণিজ্যিক স্বার্থের অস্বাভাবিক প্রভাব রয়েছে। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মধ্য আমেরিকার কয়েকটি দেশে বিদেশি ফল রপ্তানিকারক কোম্পানির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যের ইতিহাস থেকে শব্দবন্ধটির উৎপত্তি।
বর্তমানে কোনো দেশের শাসনব্যবস্থায় জবাবদিহির অভাব, আইনের শাসনের দুর্বলতা কিংবা ক্ষমতাসীনদের স্বেচ্ছাচারিতার সমালোচনা করতেও ‘ব্যানানা রিপাবলিক’ পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়।
শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকা প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘিরে ব্যাপক ধরপাকড়ের মধ্যে এসব মন্তব্য করেন বিজেপির এই নেতা। কর্মসূচিতে যোগ দিতে কিংবা সংহতি জানাতে গিয়ে আটক হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন, ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি এবং বামপন্থি দলগুলোর একাধিক নেতা। এ ছাড়া শিক্ষার্থী, আইনজীবী ও অন্যান্য আন্দোলনকারীকেও আটক করেছে পুলিশ।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিজেপির মুখপাত্রের বক্তব্যের বড় অংশ জুড়েই ছিল লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইনডিয়া জোটের সাম্প্রতিক আন্দোলনের সমালোচনা। শুক্রবার আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ও পুদুচেরিতে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএর সাফল্যের প্রসঙ্গও টানেন তিনি।
রবি শঙ্কর প্রসাদ বলেন, শনিবার ও গত তিন দিনের ঘটনাবলির ওপর ভিত্তি করে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথমত, বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির চক্রান্তকে নস্যাৎ করে দিয়েছে ভারতীয় গণতন্ত্র। দ্বিতীয়ত, দেশ পরিচালিত হবে সংসদ দিয়ে, রাজপথ দিয়ে নয়।
তিনি আরও বলেন, ‘গত কয়েক দিন ধরে দিল্লিতে এসব অপচেষ্টা চলার মধ্যেই প্রতিটি নির্বাচন হয়েছে। বিজেপি বিশেষভাবে তুলে ধরতে চায়, বঙ্গ, আসাম ও পুদুচেরিতে চমৎকার সাফল্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দিল্লি ও দেশের অন্যান্য অংশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির এক আন্দোলন চলছিল।’
সরাসরি সিজেপির নাম না নিলেও কংগ্রেসকে উদ্দেশ করে বিজেপির এই নেতা বলেন, ‘আমরা প্রতিবাদ বা আন্দোলনের বিরুদ্ধে নই, তবে আপনারা নির্বাচনে টানা পরাজয়ের কারণে রাজপথের আন্দোলনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন।’
‘পরাজিত ও হতাশাগ্রস্ত মানুষগুলো গত তিন-চার দিন ধরে দিল্লির সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলছে এবং রাজপথের আন্দোলনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। তবে আমরা ভারতের জনগণের জন্য গর্বিত। তারা এই ষড়যন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ব্যর্থ করে দিয়েছে।’
চলমান আন্দোলনের প্রতি সাধারণ মানুষের ‘কোনো সমর্থন নেই’ বলেও দাবি করেন রবি শঙ্কর প্রসাদ। একই সঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পক্ষে অবস্থান নেন তিনি।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) বাতিল এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের আইন পরিবর্তনের দাবিতে দিল্লিতে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল সিজেপি। দলটি কর্মসূচির নাম দিয়েছিল ‘যন্তর মন্তর ২.০’। তবে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতি দেয়নি দিল্লি পুলিশ। কর্মসূচি ঘিরে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এবং আন্দোলনকারীদের আটকে অভিযান চালানো হয়।
হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার সকালে দিল্লির সাউথ অ্যাভিনিউ বাসস্ট্যান্ডের কাছে ধর্নায় বসার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আটক করা হয়। তার সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের কয়েকজন সাংসদকেও আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন ডেরেক ও’ব্রায়েন, দোলা সেন, প্রতিমা মণ্ডল, সামিরুল ইসলাম ও সাকেত গোখলে।
এদিকে, যন্তর মন্তরে বিক্ষোভে যোগ দিতে গিয়ে আটক হন কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) বা সিপিআই-এম জানিয়েছে, দলটির সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি, নেতা এম ভি গোবিন্দন মাস্টার, এ বিজয়রাঘবন, কে কে শৈলজা, জন ব্রিটাস, কে এন বালাগোপাল ও বৃন্দা কারাতকেও আটক করেছে পুলিশ।
দিল্লি জুড়ে অভিযান চালিয়ে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) কেন্দ্রীয় সভাপতি নেহা বোরাক এবং দলটির আইনি উপদেষ্টা আইনজীবী রত্না সিংহসহ অন্তত সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষকে আটক করার খবর পাওয়া গেছে। আন্দোলনকারীদের যন্তর মন্তরে যেতে বাধা দিতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।
আটক ধ্রুব রাঠি ও তুষার গান্ধী
দিল্লির বিক্ষোভে যোগ দিতে যাওয়ার আগে হরিয়ানার গুরুগ্রামে নিজের বাসা থেকে ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে আটক করেছে পুলিশ। শনিবার সকালে গুরুগ্রামের সেক্টর-৫৬-এর কেন্দ্রীয় বিহার সোসাইটিতে তার বাসায় পৌঁছান দিল্লি ও গুরুগ্রাম পুলিশের সদস্যরা। পরে তাকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয় বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
হিন্দুস্তান টাইমসকে পুলিশ জানিয়েছে, যন্তর মন্তরের বিক্ষোভে যোগ দিতে ধ্রুব রাঠিকে দিল্লি যেতে নিষেধ করা হয়েছিল। পুলিশের নির্দেশনা না মানায় তাকে আটক করা হয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ।
অন্যদিকে, সিজেপির কর্মসূচির প্রতি সংহতি জানিয়ে মুম্বাইয়ে আয়োজিত বিক্ষোভে যোগ দিতে যাওয়ার পথে আটক হয়েছেন মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র ও ‘হাম ভারত কে লগ’ সংগঠনের সভাপতি তুষার গান্ধী। শনিবার বিকেল সাড়ে তিনটায় মুম্বাইয়ের আগস্ট ক্রান্তি ময়দানে কর্মসূচিটি আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিল তার সংগঠন। সেখানে যাওয়ার পথে বান্দ্রা এলাকা থেকে তাকে আটক করে ডিএন নগর থানায় নেওয়া হয়। তার এক সহযোগী ও সংগঠনটির সহসভাপতিকেও আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের দাবি, কর্মসূচির অনুমতি চেয়ে কোনো আবেদন জমা দেওয়া হয়নি। তাই ওই কর্মসূচির অনুমতিও দেওয়া হয়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তুষার গান্ধী তাকে আটক করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
শিক্ষার্থী ও আইনজীবীদেরও আটক
বিক্ষোভস্থল যন্তর মন্তরের পরিবর্তে দিল্লি হাটের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি নেহা বোরাককে আটক করে পুলিশ। এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, যন্তর মন্তরের পরিবর্তে দিল্লি হাটে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হবে।
২৯ বছর বয়সী নেহা দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী। তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) লিবারেশনের ছাত্রসংগঠন এআইএসএর সভাপতি। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থী ও তরুণদের আন্দোলনে তিনি অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন।
এ ছাড়া দিল্লির বাংলা সাহিব গুরুদুয়ারা থেকে ৬০ জনের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। বিক্ষোভে যোগ দিতে এসে তারা রাতে গুরুদুয়ারায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। শনিবার সকালে সেখান থেকে বের হয়ে কর্মসূচিতে যাওয়ার পথে তাদের আটক করা হয়।
সিজেপির আইনি উপদেষ্টা আইনজীবী রত্না সিংহকেও আটক করা হয়েছে। দলের নেতা সৌরভ দাস জানিয়েছেন, আইনজীবীদের একটি প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাওয়ার সময় তাকে আটক করা হয়। বিক্ষোভে যোগ দিতে যাওয়ার পথে আরও কয়েকজন আইনজীবীকে আটকের ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ চেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন।
আন্দোলনকারীদের পাশে থাকার ঘোষণা রাহুল গান্ধীর
বিক্ষোভের সময় চেন্নাইয়ে শিক্ষার্থীদের একটি মতবিনিময় কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছিলেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি আন্দোলনকারীদের প্রতি সমর্থন জানান। রাহুল গান্ধী লেখেন, ‘সব নেতাকে গ্রেপ্তার করুন। সব তরুণকে গ্রেপ্তার করুন। আমাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করুন।’
তিনি আরও লেখেন, ‘আমরা আপনাদের ঘিরে ফেলছি, আর পেছনে ফিরব না। আমার কথা মিলিয়ে নেবেন, আমাদের প্রয়োজনীয় তথ্য আগেই আমরা পেয়ে গেছি…। ভারতের তরুণ সমাজ, আমি তোমাদের জন্য গর্বিত। প্রতিবাদ চালিয়ে যাও। আমরা তোমাদের পাশে আছি।’
source: Rajneete







