রাষ্ট্রের টাকায় বেসরকারি হাসপাতালে জনগণকে চিকিৎসা দেবে সরকার

রাষ্ট্রের টাকায় বেসরকারি হাসপাতালে জনগণকে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা মেডিকেলে রোগীর চাপ কমাতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা না বাড়িয়ে রাষ্ট্রের টাকায় জনগণকে কেন বেসরকারিতে চিকিৎসা দিতে হবে তার উত্তর মেলেনি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর চাপ কমাতে রাজধানীর চারটি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ভর্তুকিতে চিকিৎসা দেওয়ার এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর তিনটিই মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) অতীত অভিজ্ঞতা ভালো নয়। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর খানের মতে, সরকার ভালো সেবা দিতে চাইলে নির্দিষ্ট কিছু হাসপাতাল বেছে না নিয়ে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা উচিত। কেননা, শুধু চুক্তি করে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব নয়। এখানে পাঁচটা রোগী দেখে ১৫টার বিল করার মতো অনিয়ম সামলানোর মতো শক্ত তদারকির ব্যবস্থা নেই।
অতীত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সক্ষমতার ঘাটতি থাকায় করোনা মহামারির সময় রিজেন্ট হাসপাতাল বা ডা. সাবরিনার ঘটনার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। এমনকি জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউটে সরকারি কর্মচারীদের বসিয়ে রেখে বেসরকারি সংস্থাকে (স্যানডোর) দিয়ে ডায়ালাইসিস চালানো হয়েছে।’
দেশের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। কাগজে-কলমে এটি ২ হাজার ৬০০ শয্যার। কিন্তু প্রতিনিয়ত এখানে পাঁচ থেকে সাত হাজার রোগী ভর্তি থাকেন।
সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হওয়া রোগীদের একটি অংশকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় বেসরকারিতে পাঠানো হবে। সেখানে ওষুধ ও পরীক্ষাসহ সব সুবিধা মিলবে। মাস শেষে হিসাব-নিকাশের পর বিল পরিশোধ করবে সরকার। এরই মধ্যে খসড়া নীতিমালা প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে কোন কোন রোগের চিকিৎসা হবে, খরচের কতটা সরকার বহন করবে এবং কতটা রোগীকে দিতে হবে। এ বিষয়গুলো এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
তালিকায় যে চার হাসপাতাল
ঢাকা মেডিকেলের আশপাশে বড় বেসরকারি হাসপাতাল না থাকায় তেজগাঁও, গুলশান ও বাড্ডার চার হাসপাতাল বেছে নিয়েছে সরকার। এগুলোর একটি তেজগাঁওয়ের এম এইচ শমরিতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। ৫২৫ শয্যার এই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান থেকে চিকিৎসাসেবা কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাকি তিনটি হলো তেজগাঁওয়ের ইমপালস হাসপাতাল, গুলশানের শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বাড্ডার ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
শমরিতা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মাস তিনেক আগে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেনের নেতৃত্বে একটি টিম হাসপাতালটি পরিদর্শনে আসে। টিমের সদস্যরা পুরো হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা ঘুরে দেখেন।
শমরিতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সিরাজুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে সরকারি হাসপাতালের রোগীর চাপ সামলাতে আমাদের এখানে রোগী পাঠানো হবে। আমরা চিকিৎসার সব রকম সুযোগ-সুবিধা দেব। সরকার বিল পরিশোধ করবে।’
তিনি বলেন, ‘মেডিসিন, সার্জারি ও গাইনিকোলজিক্যাল সার্জারির মতো বিভিন্ন বিভাগের রোগীরা এই সুবিধা পেলে একদিকে জনগণ সেবা পাবে। অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালের মেঝে বা বারান্দায় চিকিৎসা না পেয়ে রোগীদের ফিরে যাওয়া কিংবা দুর্ভোগের চিত্র কমবে।’
কিসের ভিত্তিতে চার হাসপাতাল বেছে নেওয়া হয়েছে এমন প্রশ্নে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত রোগী নেই। এতে শিক্ষার্থীরা সঠিক ব্যবহারিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে ঢাকা মেডিকেলের মতো সরকারি হাসপাতালগুলো ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি রোগী নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। এই সংকট নিরসনে বেসরকারি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসাসেবা কেনার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।’
তিনি বলেন, ‘আইন অনুযায়ী ১০০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে মেডিকেল কলেজে ৫০০ বেড এবং গড়ে ৭০ শতাংশ রোগী থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ফি বেশি হওয়ায় অনেক বেসরকারি হাসপাতালে রোগী থাকেন না। আইনি জটিলতা বা চাপ দিয়েও এর সমাধান মিলছে না। সরকার যদি এসব হাসপাতালে নির্দিষ্ট ভর্তুকি দিয়ে সরকারি হাসপাতালের অতিরিক্ত রোগী পাঠায়, তবে তা সবার জন্যই লাভজনক হবে।’
ডা. নাজমুল হোসেন বলেন, ‘এক হাজার শয্যার একটি নতুন সরকারি হাসপাতাল তৈরি করতে অন্তত ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা এবং তিন বছর সময় প্রয়োজন। কিন্তু চুক্তির মাধ্যমে এক দিনের মধ্যেই এই শয্যাগুলো যুক্ত করা সম্ভব। এতে ঢাকা মেডিকেলের ওপর চাপ কমবে। সরকারি ও বেসরকারি; উভয় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রোগী দেখার সুযোগ পাবেন। কম খরচে দ্রুত সেবার মান বাড়ানো সম্ভব হবে।’
সেবা দেওয়া হবে যেভাবে
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সব চূড়ান্ত হলে বেসরকারি হাসপাতালকে চুক্তি করতে হবে একটি সরকারি হাসপাতালের সঙ্গে। সরকারি হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের একটি অংশকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পাঠানো হবে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি হাসপাতালে। সরকারিতে ওষুধ ও পরীক্ষাসহ যেসব সুবিধা আছে, সেখানেও তা-ই মিলবে। মাস শেষে হিসাব-নিকাশের পর বিল পরিশোধ করবে সরকার।
শুরুতে মেডিসিন, শিশু ও ছোটখাটো সার্জারির রোগীদের পাঠানো হবে। এরই মধ্যে চার হাসপাতালের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। আগামী সপ্তাহে আরেক দফা বৈঠকের কথা রয়েছে।
রোগীর বিল কেমন হবে এবং কোন উপায়ে সরকার তা পরিশোধ করবে, এ নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। কোন ধরনের রোগী বেসরকারিতে পাঠানো হবে, তা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে কী ধরনের রোগী পাঠাব, এটা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। বিষয়টি নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আমরা সরকারিভাবে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের ব্যবস্থা করব। তবে এর বাইরেও অন্যান্য খরচ থাকে। যেমন: একজন ক্যানসার রোগী পাঠানো হলে অনেক খরচ হবে। এসব ক্ষেত্রে রোগীদের ওপর কী পরিমাণ চার্জ করা হবে, সেগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।’
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সরকারের পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) নীতির আওতায় শুরুতে ঢাকার চারটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এটি ঢাকার বাইরেও সম্প্রসারণের কাজ চলছে। ভবিষ্যতে আইসিইউ, সিসিইউ ও ডায়ালাইসিস সেবায় এটি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতালগুলো তাদের নিজস্ব জনবল দিয়ে সেবা দেবে। সরকার রোগীপ্রতি দৈনিক খরচের একটি নির্দিষ্ট অংশ বিল হিসেবে পরিশোধ করবে। এর একটি খসড়া সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ইতিমধ্যে তৈরি করা হয়েছে। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) সংক্রান্ত কিছু আইনি বিষয় নিরসন হলেই এটি চূড়ান্তভাবে চালু হবে।
প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত হতে আরও কিছু সময় লাগবে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আগামী সপ্তাহে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আরও একটি বৈঠক হবে। সেখানে বিষয়গুলো চূড়ান্ত হলে এই উদ্যোগ কার্যকর করা সম্ভব হবে।’
শুধু চুক্তি নয়, প্রয়োজন জোরালো তদারকি
বেসরকারি হাসপাতাল থেকে স্বাস্থ্যসেবা কেনার বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত হলেও এর বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, ‘কোন কোন হাসপাতাল থেকে সেবা নেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন কোন প্রক্রিয়ায় রোগী যাবে এবং চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের সুযোগ কতটুকু থাকবে, সেসব বিষয়ে নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। বিষয়টি কেবল কাগজে-কলমে ঠিক হলেই হবে না। বাস্তবে রোগী পাঠানো এবং চিকিৎসা শুরুর ক্ষেত্রে অনেক জটিলতা রয়েছে।’
সরকার দায়িত্ব নিচ্ছে বলে এখানে সঠিক ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি বলে উল্লেখ করেন ডা. জাহিদ রায়হান। তিনি বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ নতুন একটি ধারণা। রোগী রেফার করার ক্ষেত্রে কোনো টিমের সুপারিশ থাকবে নাকি চিকিৎসক বা রোগীর নিজস্ব পছন্দ থাকবে, তা নিয়ে আমরা চিন্তাভাবনা করছি। তবে সব ক্ষেত্রে রোগীর ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিলে তা প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না-ও হতে পারে।’
হাসপাতালের শয্যা সংকট ছাড়াও সেবার মান সম্পর্কিত অন্যান্য ঘাটতি চিহ্নিত করে তা সমাধানের ওপর জোর দেন ডা. জাহিদ রায়হান। সরকারি হাসপাতালে যন্ত্রপাতি বা বরাদ্দের ঘাটতি রেখে বেসরকারিতে বরাদ্দ দেওয়া নিয়ে যেন কোনো প্রশ্ন বা বিতর্ক না ওঠে, সে জন্য সরকার সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা বজায় রাখতে চায় বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
বেসরকারি হাসপাতালের সেবার মান ও সক্ষমতার বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীও কথা বলেছেন। মন্ত্রী বলেন, ‘যে কোনো হাসপাতাল তাদের নিজস্ব সক্ষমতা অনুযায়ী চিকিৎসা দেবে। আমাদের কাছ থেকে রোগী নিয়ে তারা খারাপ চিকিৎসা দিতে পারবে না। কোনো হাসপাতাল কোন চিকিৎসায় ভালো সার্ভিস দিতে পারবে, তা তারা নিজেরা ঠিক করে আমাদের সঙ্গে বসবে।’
নির্বাচিত হাসপাতালগুলোর সেবার মান ও খরচ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর খান। তিনি বলেন, ‘ইউনাইটেড যে সেবা দেবে, শমরিতা বা শাহাবুদ্দিন মেডিকেল তা দিতে পারবে না। কিন্তু সরকারের সমস্যা হলো, সব ক্ষেত্রে ‘ওয়ান সাইজ ফিট ফর অল’ নীতি চাপিয়ে দেওয়া। ঢাকার সব সার্কিট হাউস বা জেলা হাসপাতালের ডিজাইন যেমন একই ধাঁচের হয়, এখানেও সেভাবে সবাইকে একই ফি কাঠামোতে বাঁধা অসম্ভব।’
রোগীদের সামাজিক বাস্তবতার দিকটিও ভাবা দরকার বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেলে যে আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের রোগী যায়, তাকে হুট করে ইউনাইটেডে নিয়ে গেলে সেখানে কঠোর কড়াকড়ি ও পরিবেশের কারণে সে এবং তার স্বজনরা মানসিকভাবে অস্বস্তিতে পড়বেন। রক্ত-মাংসের মানুষ আর তার অ্যাটেনডেন্টকে শুধু স্থানান্তর করলেই সেবা নিশ্চিত হয় না। সরকার যদি সত্যিই ভালো সেবা দিতে চায়, তবে নির্দিষ্ট কিছু হাসপাতাল বেছে না নিয়ে উন্মুক্ত দরপত্র (ওপেন টেন্ডার) আহ্বান করা উচিত। এতে স্বচ্ছতা আসবে এবং যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো সামনে আসার সুযোগ পাবে।’
source: Asia Post






