ফ্লাইদুবাই বিমানে হামলার ঘটনা ইসরায়েল ও আমিরাতের সাজানো নাটক: ইরান

ইসরায়েলগামী ফ্লাইদুবাই বিমানের ককপিটে সংঘাত ও রক্তারক্তির ঘটনাকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের যৌথ ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ বলে দাবি করেছে ইরান।
‘ফলস ফ্ল্যাগ’ বলতে এমন একটি সাজানো ঘটনাকে বোঝায়, যার দায় অন্য পক্ষের ওপর চাপানোর উদ্দেশ্যে সেটি পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়। তেহরানের অভিযোগ, রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়া এবং ইরানের ওপর দায় চাপানোর উদ্দেশ্যেই এ ঘটনা সাজানো হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভির বরাত দিয়ে ইন্ডিয়া টুডের খবরে বলা হয়েছে, আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করা এবং ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক পদক্ষেপের অজুহাত তৈরির লক্ষ্যেই নেতানিয়াহু এ পরিকল্পনা করেছেন বলে অভিযোগ তেহরানের।
প্রেস টিভির খবরে বলা হয়েছে, ঘটনার এক দিন আগে গোপনে আবুধাবি সফর করেন নেতানিয়াহু। সেখানে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। এর পরদিন দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের ফ্লাইটে ককপিটে সংঘাতের ঘটনা ঘটে।
গত বুধবারের ওই ফ্লাইটে ১৭০ জনের বেশি যাত্রী ছিলেন। ফ্লাইট এফজেড১০৭৩ স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৫ মিনিটে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের উদ্দেশে উড্ডয়ন করে। যাত্রার প্রায় দুই ঘণ্টা পর বিমানটি প্রায় ৩০ হাজার ফুট উচ্চতায় থাকা অবস্থায় হঠাৎ ১৭ হাজার ফুটের বেশি নিচে নেমে যায়। বিমান ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এও উচ্চতা কমে যাওয়ার তথ্য দেখা যায়। এর কয়েক মিনিট পর বিমানটি জরুরি সংকেত পাঠায়।
এ সময় ককপিটে সহকারী পাইলটকে ছুরিকাঘাত করে বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন এক ব্যক্তি। পরে যাত্রী ও ক্রুরা তাকে কাবু করে বেঁধে ফেলেন এবং বিমানটির নিয়ন্ত্রণ পুনরায় নিজেদের হাতে নেন। কিছু সময়ের জন্য বিমানটি জর্ডানের আকাশসীমায় প্রবেশ করলেও পরে সৌদি আরবের দিকে ফিরে যায়। শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে সেটি।

সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চিকিৎসকরা ছাড়পত্র দেওয়ার পর বৃহস্পতিবার সকালে পাইলট ও সহকারী পাইলট দুজনকেই সংযুক্ত আরব আমিরাতে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
ইরানের অভিযোগ, ককপিটের ঘটনাটিকে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে তুলে ধরে ওমানের নাগরিক সহকারী পাইলটকে ‘চরমপন্থি’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন নেতানিয়াহু। ইরান আরও বলছে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এ ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৯/১১ হামলার সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং এর পেছনে ইরানের হাত থাকার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। তবে এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও ‘ইহুদিবিদ্বেষী ষড়যন্ত্র’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরায়েল।
মার্কিন গণমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু দাবি করেন, বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করা ব্যক্তি ‘ইসলামপন্থি চরমপন্থায় দীক্ষিত’ ছিলেন। তার ভাষ্য, ওই ব্যক্তি ওমানের নাগরিক এবং ‘খুব সম্ভবত’ বিমানটিকে ভূপাতিত করার চেষ্টা করেছিলেন।
নেতানিয়াহু বলেন, যাত্রী ও ক্রুরা হামলাকারীকে কাবু করে বেঁধে ফেলার পর তিনি ক্রুদের উদ্দেশে বারবার বলছিলেন, ‘আমাকে মেরে ফেলো, আমাকে মেরে ফেলো।’ তার ভাষ্য, এ থেকে ‘প্রশ্নাতীতভাবে স্পষ্ট’ যে ওই ব্যক্তি আত্মঘাতী হতে চেয়েছিলেন।
তিনি আরও বলেন, ‘উড়োজাহাজটিতে অনেক যাত্রী ছিলেন। এর সঙ্গে আমি যে ইসলামপন্থি প্রবণতা ও তার অতীতে উগ্রপন্থায় দীক্ষিত হওয়ার যেসব তথ্য পাওয়ার কথা বললাম, সেগুলো মিলিয়ে দেখলে… আমার মনে হয়… আমরা একটা বেশ ভালো সূত্র পেয়ে যাব।’

তবে হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখনই কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চান না বলেও জানিয়েছেন নেতানিয়াহু। একই নেটওয়ার্কে তাকে প্রশ্ন করা হলে ঘটনায় ইরানের সম্পৃক্ততার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া গেছে কি না, জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে এখনই কিছু বললে সেটি খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে।’
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে ইঙ্গিত দিয়েছেন, এ ঘটনার পেছনে ইরানের ভূমিকা থাকতে পারে। তবে তারা সরাসরি তেহরানকে দায়ী করেননি।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, হামলায় ইরানের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে দেশটির ওপর ‘কঠোর আঘাত’ হানা হবে। অন্য এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, এ ঘটনায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোরের (আইআরজিসি) সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, ঘটনাটির সঙ্গে কোনো ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা উদ্দেশ্যে’র যোগসূত্র আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু হয়েছে।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও ওমান এখনো ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেনি। কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা দেশগুলোর পাইলটদের সাধারণত ইসরায়েলগামী ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয় না।
সন্দেহভাজন ওমানি নাগরিক কীভাবে ওই বিমানে ছিলেন— এমন প্রশ্নের জবাবে নেতানিয়াহু বলেন, এখানে স্পষ্টতই একটি ফাঁক ছিল। আমিরাত সরকারের পূর্ণ সহযোগিতায় অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি এ বিষয়টিরও সমাধান করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে উভয় পক্ষ কাজ করছে বলেও উল্লেখ করেন।
ঘটনাটি নিয়ে ইসরায়েলও পৃথক তদন্ত করেছে। বিবিসি আরবিকে ইসরায়েলের এক নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, ওই তদন্তের প্রাথমিক ফলাফলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, হামলাকারীর উদ্দেশ্য ছিল বিমানটিকে বিধ্বস্ত করা। সূত্রটির ভাষ্য, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের নেতৃত্বে তদন্তটি পরিচালিত হয়েছে। ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে তেল আবিবে পৌঁছানোর পর বিমানের যাত্রীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ছুরিকাঘাতে আহত ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারকে ‘নায়ক’ বলে অভিহিত করেছেন নেতানিয়াহু ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বৃহস্পতিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত দীপক মিত্তাল হাসপাতালে গিয়ে মাচ্ছারের সঙ্গে দেখা করেন। পরে ভারতীয় দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানায়, তিনি সুস্থ আছেন এবং সেরে উঠছেন।
ঘটনার পর ফ্লাইদুবাই নিজস্ব তদন্ত শুরু করেছে। তদন্তের স্বার্থে দুবাই ও তেল আবিবের মধ্যে ফ্লাইট চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। ইসরায়েলের পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নেতানিয়াহুর নির্দেশনায় এ স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে এল আল, ইসরায়ার ও আরকিয়া জানিয়েছে, দুবাইয়ে আটকে পড়া যাত্রীদের ফিরিয়ে আনতে শুক্রবার থেকে বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আবুধাবি ও তেল আবিবের মধ্যে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়াতে ইতিহাদ এয়ারওয়েজকে জরুরি অনুরোধ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলের পরিবহন মন্ত্রণালয়।
source: Rajneete






