আদালতের নির্দেশ, তবু হোয়াইট হাউজের নৈশভোজে ঢুকতে পারেননি ২ সাংবাদিক

আদালতের নির্দেশে হোয়াইট হাউজে প্রবেশের অনুমতি ফিরে পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবার বাধার মুখে পড়েছেন সিএনএন ও এমএস নাউয়ের সাংবাদিকরা। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্মানে হোয়াইট হাউজে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে এই দুই সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এর মধ্য দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ও মার্কিন সংবাদমাধ্যমের কয়েক দিনের সংঘাত নতুন মোড় নিয়েছে।
গার্ডিয়ান এবং বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও এপির খবরে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) হোয়াইট হাউজে নৈশভোজ আয়োজন করা হয়েছিল চীনা প্রেসিডেন্টের সম্মানে। সেখানেই বাধার মুখে পড়েন দুই গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা।
এর আগে বুধবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের জেলা জজ টিমোথি কেলি এই দুই সংবাদমাধ্যমসহ পলিটিকোর সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউজে প্রবেশাধিকার ‘অবিলম্বে ফিরিয়ে দিতে, পুনর্বহাল করতে ও পুনর্স্থাপন করতে’ নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই তিন মিডিয়ার সাংবাদিকদের ওপর হোয়াইট হাউজে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন।
১৪ দিনের জন্য কার্যকর আদেশে বিচারক কেলি বলেন, সাংবাদিকদের প্রেস পাস বাতিলের ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি— এমন দাবি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিন সংবাদমাধ্যমের ‘সাফল্যের সম্ভাবনা’ রয়েছে।
কিন্তু বৃহস্পতিবার সকালে আদালতের আদেশ কার্যকর করা নিয়ে নতুন জটিলতা তৈরি হয়। সিএনএন, এমএস নাউ ও পলিটিকোর সাংবাদিকেরা হোয়াইট হাউজে ঢোকার চেষ্টা করলে শুরুতে তাদের ফেরত পাঠানো হয়। কয়েকজনের প্রেস পাসও আবার জব্দ করে সিক্রেট সার্ভিস। তিন প্রতিষ্ঠানের আইনজীবীরা আদালতে জরুরি শুনানির আবেদন করে অভিযোগ করেন, প্রশাসন বিচারকের আদেশ ‘বারবার লঙ্ঘন’ করছে।
পরে হোয়াইট হাউজের প্রেস অপারেশনস পরিচালক মাইকা স্টপারিশ আদালতে দেওয়া হলফনামায় জানান, সকাল ৭টা ১০ মিনিটে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার পুনর্বহালের প্রক্রিয়া শুরু হয়। সকাল ৯টা ৭ মিনিটে সিক্রেট সার্ভিস জানায়, সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের ব্যাজ পুনরায় সক্রিয় করা হয়েছে। এরপর সকাল ১০টার কিছু আগে জব্দ করা ব্যাজগুলো প্রবেশপথে পৌঁছে দেওয়া হয়। দুপুরের দিকে তিন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকেরা আবার হোয়াইট হাউজে ঢুকতে সক্ষম হন।
দিনের এই অচলাবস্থা কাটার পরও সংঘাত থামেনি। শি জিনপিং ও তার স্ত্রী পেং লিয়ুয়ানের হোয়াইট হাউজে পৌঁছানোর অনুষ্ঠানে সিএনএনের দুই সাংবাদিককে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। সিএনএন জানিয়েছে, অনুষ্ঠানের প্রায় এক ঘণ্টা আগে হোয়াইট হাউজ তাদের জানিয়েছিল, কেবল একজন ফটোসাংবাদিক ও একজন অডিও টেকনিশিয়ানকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। কিন্তু নেটওয়ার্কের প্রতিবেদক ও প্রযোজককে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
এমএস নাউয়ের হোয়াইট হাউজ প্রতিবেদক লরা ব্যারন-লোপেজও জিনপিংয়ের নৈশভোজে আগমনের অনুষ্ঠান কাভার করতে পারেননি। তিনি কেন ঢুকতে পারছেন না— জানতে চাইলে এক হোয়াইট হাউজ কর্মকর্তা তাকে যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চেউংয়ের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
অর্থাৎ দিনের শুরুতে সিএনএন, এমএস নাউ ও পলিটিকোর সাংবাদিকরা আদালতের আদেশে হোয়াইট হাউজে ঢুকতে পারলেও নৈশভোজের অনুষ্ঠানে বাধার মুখে পড়েন। অর্থাৎ বিচারকের আদেশে সাধারণ প্রবেশাধিকার ফিরলেও কোন সাংবাদিক কোন অনুষ্ঠান কাভার করতে পারবেন— সে প্রশ্নে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে নতুন বিরোধ দেখা দেয়।
কেন এই সংঘাত
এই বিরোধের সূত্রপাত গত শনিবার। ট্রাম্প প্রশাসন সিএনএন, এমএস নাউ ও পলিটিকোর সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউজ প্রবেশাধিকার বাতিল করে। ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিন সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ‘ফেক নিউজ’ ছড়ানোর অভিযোগ তুলে তাদের নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেন। পরে হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ এবং সংবেদনশীল বা শ্রেণিবদ্ধ তথ্য প্রকাশের অভিযোগও তোলা হয়।
হোয়াইট হাউজ সিএনএনকে দেওয়া এক চিঠিতে ইরান যুদ্ধ নিয়ে কয়েকটি প্রতিবেদন এবং ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ইস্ট উইং বলরুমের নিচে সামরিক বাংকার নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে একটি প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে। প্রশাসনের দাবি, ওই প্রতিবেদনে ‘টপ সিক্রেট’ নির্মাণ-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল।
তবে আদালতে বিচারক কেলি প্রশাসনের এই যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুরুতে ট্রাম্প নিজেই সংবাদমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তার অভিযোগ করেননি, বরং তাদের ‘নেতিবাচক’ ও ‘ফেক নিউজ’ প্রতিবেদনের সমালোচনা করেছিলেন। বিচারক প্রশাসনের দেওয়া সাংবাদিকতার মানদণ্ডকেও এতটাই অস্পষ্ট বলে মন্তব্য করেন যে সেটি দিয়ে প্রেস পাস বাতিলের সিদ্ধান্ত যথেষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
আদালতে মুখোমুখি দুই পক্ষ
বুধবারের শুনানিতে তিন সংবাদমাধ্যমের আইনজীবী থিওডোর বুট্রোস জুনিয়র যুক্তি দেন, হোয়াইট হাউজে বিশ্বনেতাদের গুরুত্বপূর্ণ সফরের সময় সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার বন্ধ রাখা তাদের অপূরণীয় ক্ষতির মুখে ফেলছে। অন্যদিকে বিচার বিভাগের আইনজীবী মাইকেল ভেলচিক বলেন, হোয়াইট হাউজে প্রবেশাধিকার কোনো অধিকার নয়, বরং একটি সুবিধা; প্রেসিডেন্ট কাকে হোয়াইট হাউজে ঢুকতে দেবেন, তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা তার রয়েছে।
কেলি আপাতত তিন সংবাদমাধ্যমের পক্ষেই অন্তর্বর্তী আদেশ দিয়েছেন। তার আদেশ দুই সপ্তাহ কার্যকর থাকবে। আগামী ৫ অক্টোবরের মধ্যে উভয় পক্ষকে পরবর্তী আইনি যুক্তি জমা দিতে হবে। এরপর দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা ঠেকাতে বা বহাল রাখতে আদালত আরও সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।
জিনপিংয়ের সফরে অস্বাভাবিক মিডিয়া পরিস্থিতি
মিডিয়া ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে চলমান এ বিতর্কের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো— এই সংঘাতের মধ্যেই ওয়াশিংটনে শি জিনপিংয়ের রাষ্ট্রীয় সফর অনুষ্ঠিত হয়েছে। জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক ও নৈশভোজ ছিল দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম। কিন্তু সিএনএনকে হোয়াইট হাউজের ভিডিও পুল থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে অন্য বড় মার্কিন টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলোও সরাসরি ভিডিও কাভারেজে অংশ নেয়নি।
হোয়াইট হাউজে প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠানগুলোর ভিডিও ধারণ ও তা অন্য সম্প্রচারমাধ্যমগুলোর মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার জন্য পাঁচটি বড় মার্কিন নেটওয়ার্কের একটি পালাক্রমিক ভিডিও পুল রয়েছে। সিএনএন সেই ব্যবস্থার অংশ। সিএনএনকে বাদ দেওয়ার পর এবিসি, সিবিএস, এনবিসি ও ফক্স নিউজের পক্ষ থেকেও সেই পুলে অংশগ্রহণ স্থগিত রাখা হয়। ফলে শি জিনপিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অতিথির সফরের দিনও বড় মার্কিন নেটওয়ার্কগুলোর সরাসরি ভিডিও কাভারেজ ছিল না।
হোয়াইট হাউজ অবশ্য তাদের নতুন চালু করা ইউটিউব চ্যানেল ট্রাম্প টিভির মাধ্যমে জিনপিংয়ের আগমনের ঘটনা সম্প্রচার করে। ট্রাম্প পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেন, বড় টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলো অনুষ্ঠানটি কাভার করতে চায়নি, কারণ তারা ট্রাম্পকে কৃতিত্ব দিতে চায়নি।
source: Rajneete






