মিয়ানমারে মানবতাবিরোধী অপরাধে সহায়তার অভিযোগে টেলিনরের বিরুদ্ধে তদন্ত

মিয়ানমারে সামরিক জান্তার কাছে গ্রাহকদের তথ্য হস্তান্তর ও নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা নজরদারি সরঞ্জাম বিক্রির অভিযোগে নরওয়ের টেলিযোগাযোগ কোম্পানি টেলিনরের বিরুদ্ধে দুটি পৃথক তদন্ত শুরু করেছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কোম্পানিটির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে সহায়তার অভিযোগও আনা হয়েছে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস ও মিয়ানারনাউয়ের খবরে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার নরওয়ের পুলিশ ও দেশটির নিরাপত্তা সংস্থা পিএসটি যৌথভাবে টেলিনরের অসলো সদর দপ্তরে অভিযান চালিয়ে নথি ও তথ্য সংগ্রহ করেছে।
নরওয়ের জাতীয় অপরাধ তদন্ত সংস্থা ক্রিপসের তদন্তে অভিযোগ করা হয়েছে, ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে ২০২২ সালের ২৫ মার্চ টেলিনরের মিয়ানমার ইউনিট বিক্রি হওয়া পর্যন্ত কোম্পানিটি দেশটির সামরিক সরকারের কাছে গ্রাহকদের টেলিযোগাযোগ তথ্য দফায় দফায় হস্তান্তর করেছে। ওই সময়ে সামরিক বাহিনী জনগণের বিরুদ্ধে ব্যাপক নিপীড়ন চালাচ্ছিল। এ তথ্য হস্তান্তর মানবতাবিরোধী অপরাধে সহায়তার পর্যায়ে পড়েছে কি না, তা তদন্ত করছে ক্রিপস।
অন্যদিকে পিএসটি তদন্ত করছে নিষেধাজ্ঞা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ। নরওয়ের পুলিশ বলছে, টেলিনরের মিয়ানমার ইউনিট বিক্রির সময় নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা একটি নজরদারি সরঞ্জামও হস্তান্তর করা হয়েছিল। এ ধরনের সরঞ্জাম বিক্রির জন্য নরওয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন হলেও সেই অনুমতি ছিল না বলে তদন্তকারীদের অভিযোগ। দুটি তদন্তের বিষয়বস্তু অনেকাংশে একই সময় ও ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় ক্রিপস ও পিএসটি সমন্বিতভাবে তদন্ত করছে।
টেলিনর অবশ্য অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। কোম্পানিটি বলেছে, সামরিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করলে মিয়ানমারে তাদের কর্মীদের কারাবন্দি, নির্যাতন কিংবা এমনকি মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি ছিল।
টেলিনরের মিডিয়া রিলেশনস পরিচালক ডেভিড ফিদেলজেলান্ড বলেন, পরিস্থিতি এমন ছিল যে কর্মীদের জীবন ঝুঁকিতে না ফেলে কোম্পানির হাতে কার্যত ‘কোনো বাস্তব বিকল্প’ ছিল না। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তদন্তে তারা পুরোপুরি সহযোগিতা করবে এবং এরই মধ্যে নরওয়ের কর্তৃপক্ষকে বিপুল পরিমাণ নথি ও তথ্য দিয়েছে।
মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর টেলিনরের কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় মূলত গ্রাহকদের তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে। টেলিনর মিয়ানমার ২০১৪ সালে কার্যক্রম শুরু করে। ২০২১ সাল নাগাদ তাদের গ্রাহক সংখ্যা এক কোটি ৮০ লাখ ছাড়িয়ে যায়।
অভ্যুত্থানের পর সামরিক নিয়ন্ত্রিত পরিবহন ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় কোম্পানিটির কাছে গ্রাহকদের কল রেকর্ড, কলের অবস্থান এবং কোনো নম্বরের সর্বশেষ অবস্থানসহ বিভিন্ন তথ্য চেয়ে শত শত নির্দেশ পাঠায়। ২০২২ সালে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, অভ্যুত্থানের পর এক বছরে সামরিক কর্তৃপক্ষ টেলিনরের কাছে ২০০টির বেশি তথ্য চেয়েছিল এবং কোম্পানিটি এসব অনুরোধ মেনে নিয়েছিল।
টেলিনর অবশ্য সে সময় বলেছিল, এসব তথ্য ছিল ‘কল ডেটা রেকর্ড’— অর্থাৎ কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে, কখন হয়েছে, কতক্ষণ হয়েছে এবং কোন মোবাইল টাওয়ার ব্যবহার করা হয়েছে— এ ধরনের মেটাডেটা। এতে ফোনকল বা বার্তার বিষয়বস্তু ছিল না। কোম্পানির বক্তব্য ছিল, মিয়ানমারের স্থানীয় আইন ও লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী এসব তথ্য সংরক্ষণ করতে তারা বাধ্য ছিল।
একই সময়ে সামরিক সরকার টেলিকম অপারেটরদের নেটওয়ার্কে ‘লফুল ইন্টারসেপশন’ বা আইনিভাবে যোগাযোগ নজরদারির ব্যবস্থা চালুর জন্য চাপ দিতে থাকে। টেলিনর জানায়, এমন নজরদারি সরঞ্জাম সক্রিয় করা নরওয়ে ও ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। কোম্পানিটি সে সময় দাবি করেছিল, তারা ওই ইন্টারসেপশন ব্যবস্থা সক্রিয় করেনি।
এরপর ২০২১ সালের জুলাইয়ে টেলিনর মিয়ানমারে তাদের পুরো ব্যবসা লেবাননের এম১ গ্রুপের কাছে ১০ কোটি ৫০ লাখ ডলারে বিক্রির ঘোষণা দেয়। শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালের ২৫ মার্চ বিক্রি সম্পন্ন হয়।
টেলিনর ওই সময় বলেছিল, সামরিক শাসনের অধীনে আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার নীতি ও নিজেদের নীতিমালা মেনে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। তাই কর্মী, গ্রাহক ও বৃহত্তর সমাজের ওপর ক্ষতি কমানোর জন্য দেশটি থেকে বেরিয়ে যাওয়াই সবচেয়ে উপযুক্ত পথ বলে তারা মনে করেছিল।
তবে ব্যবসা বিক্রির প্রক্রিয়াটিও নতুন বিতর্ক তৈরি করে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে— এমন স্থানীয় অংশীদারের হাতে ব্যবসাটি যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন মানবাধিকার কর্মীরা। একই সঙ্গে টেলিনরের নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত নজরদারি প্রযুক্তি নতুন মালিকের হাতে চলে যাওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়। নরওয়ের বর্তমান নিষেধাজ্ঞা তদন্তে এই নজরদারি সরঞ্জাম হস্তান্তরের বিষয়টিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
টেলিনরের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ এই প্রথম নয়। এর আগে গত এপ্রিলে মিয়ানমারের ১২ শতাধিক গ্রাহকের পক্ষে নরওয়ের আদালতে একটি শ্রেণিগত ক্ষতিপূরণ মামলা করা হয়। অভিযোগ, সামরিক বাহিনীর কাছে ফোন ও অবস্থানের তথ্য হস্তান্তরের ফলেই বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী ও অধিকার কর্মীদের ওপর নিপীড়ন চালানো সম্ভব হয়েছিল। মামলায় ফোনের তথ্যের কারণে রাজনৈতিক কর্মী ফো জেয়া থাওয়ের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর এবং অন্য এক সমাজকর্মীর ফের গ্রেপ্তার ও কারাবাসের ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে।
এখন নরওয়ের তদন্তে টেলিনরের বিরুদ্ধে অভিযোগ দুটি আলাদা আইনি প্রশ্নে গড়িয়েছে— সামরিক সরকারের হাতে গ্রাহকদের তথ্য যাওয়ার মাধ্যমে কোম্পানিটি মানবতাবিরোধী অপরাধে সহায়তা করেছে কি না এবং মিয়ানমার ইউনিট বিক্রির সময় নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা নজরদারি সরঞ্জাম অনুমোদন ছাড়া হস্তান্তর করেছে কি না। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়নি বা কোনো ব্যক্তিকে তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়নি। কোম্পানিটির বিরুদ্ধেই তদন্ত ও অভিযোগ রয়েছে।
মঙ্গলবারের অভিযান ও তদন্তের প্রতিক্রিয়ায় টেলিনর জানিয়েছে, তারা পুলিশের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করবে এবং তদন্তের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করবে। নরওয়ে কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, তদন্ত চলমান থাকায় এ মুহূর্তে এর বেশি বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে না।
source: Rajneete







