সৌদি যুদ্ধবিমান ভূপাতিতের দাবি হুতিদের, মক্কাকে টার্গেট করার অভিযোগ অস্বীকার

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে। অন্যদিকে সৌদি আরব জানিয়েছে, পবিত্র মক্কা নগরীর কাছে হুতিদের একটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। তবে মক্কাকে লক্ষ্য করে কোনো হামলা চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে হুতিরা। পালটাপালটি এসব দাবির মধ্যে সৌদি আরব ও হুতিদের দীর্ঘদিনের সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় সৌদি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেন। তার ভাষ্য, ইয়েমেনের ভূখণ্ডের ওপর স্থানীয়ভাবে তৈরি একটি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত করা হয়েছে।
হুতিদের পক্ষ থেকে দেওয়া পৃথক বিবৃতিতে বলা হয়, ইয়েমেনের মারিব এলাকায় ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য একটি স্থানীয়ভাবে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে সৌদি যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত করা হয়। ইয়েমেনের মারিবের আকাশসীমায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনীর তৎপরতায় সহায়তা করার সময় যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত করা হয়েছে বলে দাবি করেন ইয়াহিয়া সারি।
এদিকে স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে আল-জাজিরা জানিয়েছে, মারিবের উত্তর-পশ্চিমে মাউন্ট হেলানের কাছে হুতিরা যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত করেছে বলে দাবি করেছে। তবে হুতিদের এই দাবির বিষয়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও যুদ্ধবিমান ভূপাতিতের দাবির বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন ইয়েমেনবিষয়ক সামরিক জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি জানিয়েছিলেন, মঙ্গলবার মক্কার দক্ষিণে একটি হুতি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। ড্রোনটি মক্কার ওপর নিষিদ্ধ আকাশসীমার দিকে যাচ্ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
তবে মক্কাকে লক্ষ্য করে কোনো হামলা চালানোর অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে হুতিরা। ইয়াহিয়া সারি সৌদি আরবের এই অভিযোগকে ‘বানোয়াট ও মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ইয়েমেন থেকে পবিত্র স্থাপনাগুলোর জন্য কোনো ধরনের হুমকি নেই।
মক্কার কাছে ড্রোন ভূপাতিতের ঘটনা নিয়ে সৌদি পক্ষের দাবি, ড্রোনটি পবিত্র নগরীর দিকে যাচ্ছিল। সৌদি জোটের মুখপাত্র আল-মালিকি বলেন, ড্রোনটি ‘পবিত্র মসজিদে আসা মুসল্লিদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং নাগরিক ও বাসিন্দাদের ক্ষতি করার চেষ্টা’ ছিল। তিনি বলেন, হাজিদের নিরাপত্তা এবং পবিত্র মসজিদগুলোর নিরাপত্তা সৌদি আরবের জন্য ‘লাল রেখা’।
মক্কা মুসলমানদের কাছে সবচেয়ে পবিত্র স্থান। ইসলামের মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মস্থান এই নগরীতে প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ হজ পালন করতে যান। সৌদি সরকারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর হজ পালনে ১৭ লাখের বেশি মানুষ মক্কায় গিয়েছিলেন। তাদের বেশির ভাগই বিদেশি।
মক্কার কাছে ড্রোন ভূপাতিতের ঘটনায় মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর জোট অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) নিন্দা জানিয়েছে। ৫৭ সদস্যের এই সংগঠন হুতিদের সৌদি আরবের বিরুদ্ধে চালানো অন্যান্য হামলারও নিন্দা করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে ওআইসি বলেছে, এ ধরনের হামলা নিরীহ মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি করে, পবিত্র স্থান ও মসজিদের মর্যাদা লঙ্ঘন করে এবং বিশ্বের মুসলমানদের অনুভূতিতে আঘাত করে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও মক্কাকে লক্ষ্য করে কথিত হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, এই ‘নিন্দনীয় ঘটনায়’ পাকিস্তানের জনগণ দুঃখিত ও উদ্বিগ্ন।
নতুন করে তীব্র হচ্ছে ইয়েমেনের সংঘাত
ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরব-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সংঘাত কয়েক বছর ধরে চললেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তা আবারও যুদ্ধের দিকে গড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান যুদ্ধের মধ্যেই ইয়েমেনের এই সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ায় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে ২০১৫ সাল থেকে হুতিদের লড়াই চলছে। ওই সময় হুতিরা রাজধানী সানা দখল করে নেয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। পরে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে যুক্ত হয় সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট।
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হুতিরা একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইয়েমেনে হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী।
সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, পবিত্র মক্কা নগরীর দিকে হুতিদের ড্রোন পাঠানোর ঘটনায় মঙ্গলবার সেখানে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়। তবে হুতিরা মক্কা বা অন্য কোনো পবিত্র স্থানকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালেও হুতিদের বিরুদ্ধে মক্কা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অভিযোগ উঠেছিল। সাম্প্রতিক ঘটনায় মক্কায় নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হলেও কয়েক মিনিটের মধ্যেই তা তুলে নেওয়া হয়। একই ধরনের সতর্কতা তাইফ ও সৌদি আরবের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর জেদ্দাতেও জারি করা হয়েছিল।
লোহিত সাগর উপকূলে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে
সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংঘাতের পাশাপাশি ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলেও পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। সম্প্রতি ওই এলাকায় হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়তে শুরু করেছে।
গত বৃহস্পতিবার হুতিরা বন্দরনগরী মোখার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরদিন বাব আল-মান্দেব প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ মায়ুন দ্বীপও তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এরপর সোমবার দক্ষিণ লোহিত সাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গ্রেটার হানিশ ও লেসার হানিশ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয় গোষ্ঠীটি।
ইয়েমেনের সরকার-সমর্থিত বাহিনী হানিশ দ্বীপপুঞ্জ থেকে পিছু হটার পর দ্বীপ দুটি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে যায়। মোখা বন্দর ও মায়ুন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ হারানোকে সরকারি বাহিনীর জন্য একটি ‘বেদনাদায়ক পরাজয়’ বলে স্বীকার করেছেন ইয়েমেনের এক কর্মকর্তা। তবে লোহিত সাগর উপকূলে আরও সেনা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইয়েমেন সরকার।
বাব আল-মান্দেব প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। বৈশ্বিক তেল ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও এর বড় ভূমিকা রয়েছে। ফলে এই এলাকায় হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সৌদির তেল অবকাঠামোয় হামলা, বন্ধ পাইপলাইন
এদিকে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি সৌদি আরবের ভেতরেও হুতিদের হামলা অব্যাহত রয়েছে। সৌদি জ্বালানি অবকাঠামো এবং লোহিত সাগরে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনায় বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও দামের ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে।
সৌদি আরবের রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে একাধিক ড্রোন হামলার পর নিরাপত্তার স্বার্থে দেশটির পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ইরাকের ভূখণ্ড থেকে সৌদি আরব ও প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে হামলা বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাগদাদকে সতর্ক করেছে রিয়াদ।
সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালে এসব হামলা চালানো হয়। এতে কয়েকজন আহত হয়েছেন বলেও জানানো হয়েছে।
শনিবার আরব নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার পরপরই পাইপলাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এর অবস্থা যাচাই করতে জরুরি ও বিশেষায়িত কারিগরি দল মোতায়েন করা হয়। সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে এসব কাজ করছে।
মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনটি বন্ধ করা হয়েছে। পরিস্থিতিতে আরও কোনো পরিবর্তন হলে তা জানানো হবে।
সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুতিদের হামলা, মক্কার কাছে ড্রোন ভূপাতিতের দাবি এবং ইয়েমেনে হুতিদের সামরিক তৎপরতা— সব মিলিয়ে আঞ্চলিক সংঘাতের পরিধি আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকায় জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর এর প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
source: Rajneete






