র্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনে সংসদে বিল

নানা ঘটনায় সমালোচিত ও বিতর্কিত র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের আওতাধীন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’ শীর্ষক বিল উত্থাপন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাতে জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬ বিল উত্থাপন করা হয়।
ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে চলা সংসদ অধিবেশনে বিলটি উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ। মূলত র্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি আইনের বিলটি উত্থাপনের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পরীক্ষা-নীরিক্ষার জন্য পাঠানো হয়।
তবে বিলটি উত্থাপনের সময় নতুন এই বাহিনীর রূপরেখা, প্রয়োজনীয়তা ও সময়সীমা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার মধ্যে বিতর্ক ও পাল্টাপাল্টি যুক্তি হয়। উত্থাপনের আগে বিলটি নিয়ে আপত্তি জানান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এবং বিরোধী দলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তারা সংসদীয় কমিটিতে দুই দিন বাদ দিয়ে কর্মদিবস বাড়ানোর দাবি জানান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চার কার্যদিবসের মধ্যে বিলটি যাচাই-বাছাই শেষে ফেরত পাঠানোর প্রস্তাব করেন। চার কর্মদিবস ঠিক করে সর্বসম্মতিতে বিলটি স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।
বিলটি উত্থাপন করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনি ইশতেহার ও জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী র্যাব নামের সংগঠনটি আমরা বিলুপ্ত করছি। তবে সাইবার ক্রাইম, জুয়া ও মাদকের মতো অপরাধ দমনে পুলিশের অধীনে একটি অত্যাধুনিক ও সুসজ্জিত এলিট ফোর্স প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যেই ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ গঠনের প্রস্তাব আনা হয়েছে।
আগের সরকারের আমলের পুলিশের সমালোচনা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘পুলিশ বাহিনীর প্রধান ছিলেন “কুখ্যাত” বেনজীর। তাই বলে আমরা পুলিশ বাহিনী বিলুপ্ত করে দেব? মাথা ব্যথা হলে মাথা কর্তন করা যায় না। প্রতিষ্ঠান যারা চালায়, সেই রাজনৈতিক অথবা মাফিয়া শক্তির দোষ হতে পারে, প্রতিষ্ঠানের কোনো দোষ নেই।’

এসআরবির স্বচ্ছতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘এই বিলে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে। নতুন বাহিনীর কোনো সদস্য শৃঙ্খলাবিরোধী কাজে জড়ালে তার বিচারের জন্য যে কমিটি করা হয়েছে, সেখানে বেসরকারি সদস্য, মানবাধিকার কর্মী এবং জুডিশিয়াল কর্মকর্তা থাকবেন। ফলে অতীতের র্যাবের মতো বিতর্কিত বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো সুযোগ নতুন এই বাহিনীর থাকবে না।’
র্যাব বিলুপ্তির প্রস্তাবকে সর্বান্তঃকরণে স্বাগত জানান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তবে নতুন বাহিনী গঠনের ক্ষেত্রে গভীর পর্যালোচনার দাবি জানিয়ে এবং অতীত ট্রমার কথা স্মরণ করিয়ে তিনি বলেন, ‘একবার চুন খেয়ে গাল ঘা হয়েছে, এখন সাদা দই দেখলেও ভয় লাগে। জাতি আজ ট্রমাটাইজড। র্যাবের দ্বারা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলা এর জ্বলন্ত প্রমাণ। এই জুলুমের কথা স্মরণ হলে এখনও অনেকে ঘুমাতে পারে না।’
নতুন বাহিনী যেন কেবল নামসর্বস্ব না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘নতুন করে একই ধরনের পারসেপশন যেন জনগণের কাছে না যায়, যে এটা জাস্ট ‘এপ্রনটা’ চেঞ্জ করা হয়েছে। জাতির সামনে যেন প্রমাণ হয় যে টোটাল কনসেপ্টটাই চেঞ্জ হয়েছে।’ এ সময় তিনি আইনটি গভীরভাবে পর্যালোচনার জন্য স্পিকার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে বিলটি উত্থাপন আজ স্থগিত রেখে আগামী সপ্তাহে আনার অনুরোধ জানান।
অধিবেশনে নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছিল আগস্টের ৮ তারিখ ২০২৪। বিরোধী দলের চিফ হুইপ সেই সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। আমি খুশি হতাম এই প্রস্তাবটা যদি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এডভাইজরি বোর্ডে তিনি প্লেস করতেন।’
বিলে যা বলা হয়েছে
‘দেশের জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন এবং পুলিশ বাহিনীকে সহায়তার জন্য আধুনিক, পেশাদার, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক একটি বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন। একইসঙ্গে এ বাহিনীর ক্ষমতা প্রয়োগে স্বচ্ছতা, তদারকি ও কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।’
বিলের ১ ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই আইন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’ নামে অভিহিত হবে।’
যেসব দায়িত্ব পালন করবে এসআরবি
বিলের ১০ ধারায় এসআর-এর দায়িত্ব ও কার্যাবলি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, ‘জননিরাপত্তা রক্ষা’, ‘সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন’, ‘বেআইনি অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার’ এবং ‘মাদক, সাইবার অপরাধ, গুম ও ভূমি দস্যুতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।
এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, মানবপাচার, অপহরণসহ মানবতাবিরোধী কাজে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করার দায়িত্বও থাকবে। আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশ অনুসারে এসব অপরাধের তদন্তও করতে পারবে ইউনিটটি।
source: Asia Post







