ইমরান খানের মুক্তি ও চিকিৎসায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাইলেন জেমিমা

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তি, চিকিৎসা ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ নিশ্চিত করতে ব্রিটিশ সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তার সাবেক স্ত্রী জেমিমা গোল্ডস্মিথ। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিন্ডের প্রতি জেমিনা প্রশ্ন রাখেন, ইমরান খান প্রসঙ্গে ‘ব্রিটেন আর কতদিন নীরব থাকবে?’
সোমবার (২৪ আগস্ট) নিজের ভেরিফায়েড এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে এক দীর্ঘ পোস্টে ইমরান খান ইস্যুতে ব্রিটিশ সরকারের এ হস্তক্ষেপ কামনা করেন জেমিমা। তিনি বলেন, পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট যে আদেশ দিয়েছেন, সে অনুযায়ী যেন ইমরানের চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়।
ইমরানের কারাবাসকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল হিসেবে বর্ণনা করে জেমিমা অভিযোগ করেন, গত তিন বছর ধরে সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের নেতৃত্বে তার রাজনৈতিক বিরোধীরা ইমরানকে ‘নিষ্ঠুরভাবে শাস্তি’ দিয়ে আসছে। জাতিসংঘের বক্তব্য অনুযায়ী, এ আচরণ নির্যাতনের পর্যায়ে পড়ছে বলেও দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, দীর্ঘদিনের এই বন্দিত্ব এখন ইমরানের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সম্ভাব্য প্রাণঘাতী প্রভাব ফেলছে।
ব্রিটিশ সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব জেমিমা গোল্ডস্মিথের সঙ্গে ইমরান খানের বিয়ে হয় ১৯৯৫ সালে। পাকিস্তানকে ১৯৯২ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ জিতিয়ে ইমরান তখন অবসরে। এই দম্পতির বিয়ে ওই সময় ক্রিকেটবিশ্ব ছাপিয়ে সারা বিশ্বেই আলোড়ন ফেলেছিল। ২০০৪ সালে তাদের বিচ্ছেদ ঘটে।
এর মধ্যে ইমরান খান ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন রাজনৈতিক দল তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের পর ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে জয় নিয়ে তার দল সরকার গঠন করে। ইমরান খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
চার বছর দায়িত্ব পালনের পর ২০২২ সালে সংসদে বিরোধী দলের আনা অনাস্থা ভোটে হেরে গিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হন তিনি। ২০২৩ সালের ৯ মে আল কাদির ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন। এর মধ্যে তার বিরুদ্ধে প্রায় দুই শ মামলা হয়েছে। ২০২৫ সালের ১৭ জানুয়ারি আল কাদির ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তাকে ১৪ বছরের কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে।
কারাবন্দি ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ জানিয়ে আসছে তার পরিবার। গত রোববার এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে পাকিস্তান সরকারকে চিঠি লিখেন বিভিন্ন দেশের একদল সাবেক অধিনায়ক।
পরিবারের অভিযোগ, ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ না দেওয়ার বিষয়টি ক্রমেই গুরুতর হয়ে উঠছে। ইমরানের আইনজীবীরাও তার কারাবাসের পরিবেশ, চিকিৎসাসুবিধা ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের বিধিনিষেধ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আপত্তি জানিয়েছেন।

পাকিস্তান সরকার অবশ্য ইমরানের বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়, বরং আইনি বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে।
এর মধ্যে ইমরান খানের চিকিৎসার বিষয়ে গত ১৮ অগাস্ট পাকিস্তান সরকারকে একটি নির্দেশ দেন পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট। তাতে একটি মেডিকেল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে ইমরান খানকে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তরের কথা বলা হয়। কিন্তু পাকিস্তান সরকার চিকিৎসার জন্য তাকে পাঠায় পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসে (পিআইএমএস) পাঠায়।
Prime Minister @andyburnham and Foreign Secretary @Ed_Miliband : how much longer will Britain remain silent?
For three years the father of my two sons, and Pakistan’s former Prime Minister, Imran Khan, has been brutally penalised by his political opponents, in a personal…
— Jemima Goldsmith (@Jemima_Khan) August 24, 2026
সুপ্রিম কোর্ট ইমরানের জন্য পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসার পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ, নিয়মিত পারিবারিক সাক্ষাৎ ও দুই ছেলের সঙ্গে সপ্তাহে দুবার ফোনে কথা বলার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান জেমিমা। তবে তার অভিযোগ, আদালতের এসব নির্দেশও কার্যকর করা হচ্ছে না।
জেমিমার দাবি, ইমরান তিন বছর ধরে নির্জন কারাবাসে রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ১০ মাস ধরে তার পরিবারের সদস্যদের তার সঙ্গে দেখা বা যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। তাকে বই, আইনজীবী ও চিকিৎসকদের কাছে যাওয়ার মতো মৌলিক সুযোগ থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে জেমিমা বলেন, জাতিসংঘের নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস অনুযায়ী টানা ১৫ দিনের বেশি নির্জন কারাবাস নিষিদ্ধ এবং তা নির্যাতন হিসেবে বিবেচিত হয়। অথচ ইমরানকে এই অবস্থায় রাখা হয়েছে তিন বছর ধরে।
জেমিমা বলেন, বিষয়টি এখন আর শুধু পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয় নয়, এটি একটি মানবাধিকার জরুরি অবস্থা। ইমরানের দুই ছেলে— সুলায়মান ও কাসিম ব্রিটিশ নাগরিক। বাবার শারীরিক অবস্থার অবনতি তারা হাজার হাজার মাইল দূর থেকে দেখতে বাধ্য হচ্ছে।
সুলায়মান ও কাসিমকে পাকিস্তানে গিয়ে বাবার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি, এমনকি পাকিস্তান সরকারের কর্মকর্তারা তাদেরও গ্রেপ্তারের প্রকাশ্য হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন জেমিমা। তার দাবি, আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও ইমরানকে ছেলেদের সঙ্গে নিয়মিত ফোনালাপের সুযোগও দেওয়া হচ্ছে না।
ইমরানের সঙ্গে ব্রিটেনের দীর্ঘ সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন জেমিমা। তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ছিলেন এবং ইংল্যান্ডে বহু বছর কাউন্টি ক্রিকেট খেলেছেন। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ব্রিটেনের সঙ্গে তার সম্পর্ক রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন জেমিমা। পাকিস্তানে বিনামূল্যে ক্যানসার হাসপাতাল ও একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাসহ তার দাতব্য কর্মকাণ্ডের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

ব্রিটিশ সরকারের কাছে এর আগেও একাধিকবার হস্তক্ষেপের আবেদন করেছেন বলে জানান জেমিমা। তার ভাষ্য, সরকারের পক্ষ থেকে গোপন কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হলেও তা কার্যকর হয়নি। সাবেক ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামিও তাকে লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন, ইমরানকে দেখতে পাকিস্তানে গেলে তার দুই ব্রিটিশ নাগরিক ছেলে গ্রেপ্তার হলেও ব্রিটেন হস্তক্ষেপ করবে না।
এবার ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতি প্রকাশ্যে ও স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জেমিমা। পাকিস্তানকে নিজস্ব সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে চলতে বাধ্য করা, ইমরানের চিকিৎসার সুযোগ ও পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং তার দীর্ঘমেয়াদি নির্জন কারাবাস বন্ধের দাবি জানান তিনি।
পাকিস্তান একটি কমনওয়েলথভুক্ত দেশ উল্লেখ করে জেমিমা বলেন, নির্বিচারে আটক, অমানবিক আচরণ ও মৌলিক অধিকার হরণের বিরুদ্ধে ব্রিটেনের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য রয়েছে। সেই নীতিগুলো শুধু সুবিধাজনক পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করলে তার অর্থ খুব কমই থাকে। নতুন বার্নহাম সরকারের প্রতি ‘সঠিক কাজটি করা’র আহ্বান জানিয়ে পোস্টটি শেষ করেন তিনি।
source: Rajneete







