সাক্ষাৎকার

আমরা একে একে সবাইকে হারালাম

হায়দার আকবর খান রনো। দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রবাদপুরুষ, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। সাম্যবাদী রাজনীতির দীক্ষা পান একেবারেই শৈশবে, পারিবারিক আবহে। সমসাময়িক অনেকের মতো রাজনৈতিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি আজও। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন এনাম আবেদীন। 

কেমন আছেন?

আসছে আগস্টে আমার বয়স ৮৭ বছর হবে। এই বয়সে যেভাবে থাকা যায় আর কি!

আপনার শৈশবের কথা জানতে চাই

আমার জন্ম ১৯৪২ সালে কলকাতা শহরে, নানাবাড়িতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলার সময় জন্ম বলে আমার নাম রাখা হয় রনো। বাবা পেশায় ছিলেন প্রকৌশলী। সেই সুবাদে তাঁকে বিভিন্ন জায়গায় চাকরি করতে হয়েছে। আমাদেরও থাকতে হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় তিনি চাকরি করেছেন।

বাংলাদেশে কখন এলেন?

আমার বাবা ছিলেন নানা সৈয়দ নওশের আলীর খুব ভক্ত। নানা নওশের আলী ছিলেন পাকিস্তানবিরোধী। বাবা ও নানা দুজনেই নড়াইলের মানুষ। নানা ভারতে থেকে গেলেন। বাবাকে বললেন, তুমি যেহেতু রাজনীতি করো না, জন্মস্থানে চলে যাও। ফলে আমরা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নড়াইলে চলে এলাম (পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পর)। তখন আমার বয়স ১২ বছর। আসার পর সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে ভর্তি হই।

নটর ডেম কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যায় ভর্তির পর কারাগারে থাকায় সেখানে বসেই আইনে ব্যাচেলর ডিগ্রি নেন। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হলেন কখন?

পদার্থবিদ্যার ছাত্র থাকাকালেই ১৯৬১ সালে গোপনে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হই। তখন ছাত্র ইউনিয়ন বলতে কিছু ছিল না (নিষিদ্ধ)। তবে ছাত্র ইউনিয়নের কিছু ছেলে তখন আরেকটি (গোপন) সংগঠন করত। কাজী জাফর, মোহম্মদ ফরহাদ এঁদের মধ্যে ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হলাম। ১৯৬২ সালে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা পালন করলাম। আসলে কলকাতায় যে বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেছি সেখানে সবই ছিল কমিউনিস্ট পার্টির লোক। কলকাতার ওই বাড়িটি (নানাবাড়ি) কমিউনিস্ট পার্টির অফিস ছিল। কমরেড মোজাফফর আহমদ, জ্যোতি বসু, এস এ দাঙ্গেসহ অনেককে আমি ওই বাড়িতে দেখেছি। আমার নানা সৈয়দ নওশের আলীও কমিউনিস্ট পার্টি করতেন। ওই সময় কলেজ স্ট্রিটে নিয়ে গিয়ে বাবা আমাকে অনেক বই কিনে দিতেন। 

আপনারা দুই ভাই মুক্তিযোদ্ধা। হায়দার আনোয়ার খান জুনো ভাই কোথায়?

তিনি ধানমণ্ডির এই বাড়িতেই আমার ঠিক নিচের তলায় থাকেন। বাংলাদেশ-কিউবা ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন দুইবার। রাজনীতি না করলেও তিনিও কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন।

আপনি তো একাধিকবার কারাবরণ করেন

হ্যাঁ, ওই সময় আমি চারবার জেলে যাই। ১৯৬২ সালে দুইবার এবং ’৬৪ ও ’৬৫ সালে আরো দুইবার। প্রথম  গ্রেপ্তারের সময় আমাকে জেলে নয়, ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে আমাকে বেশ কিছুদিন আটকে রাখা হয়, পরে জেলে পাঠানো হয়। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়েই জেলে যাই। সেখানে ২৬ সেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, মানিক মিয়া ও রণেশ দাশগুপ্তসহ অনেকের সঙ্গে ছিলাম। তবে জেলে যাওয়ার আগে থেকেই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল।

ছাত্র ইউনিয়নকে পুনরুজ্জীবিত করার সঙ্গে আপনি জড়িত ছিলেন

সর্বশেষ জেলখানা থেকে আমি বের হওয়ার আগেই ১৯৬৫ সালে মেনন গ্রুপ ও মতিয়া গ্রুপ নামে ছাত্র ইউনিয়ন ভাগ হয়ে যায়। কারাগার থেকে বেরিয়ে আমি মেনন গ্রুপকে সংগঠিত করার চেষ্টা করলাম। ১৯৬৬ সালে ঘটনাক্রমে আমি টঙ্গীতে শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলাম। এর আগে ১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বামপন্থীরা মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম যে একটি সাংগঠনিক রূপ দেওয়া দরকার। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ছাত্রদের ঢাকায় এনে কমিটি গঠন করা হলো। বস্তুত ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসনের সময় বিলুপ্ত হওয়া পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নকে ১৯৬২ সালে এক সম্মেলনের মধ্য দিয়ে পুনরুজ্জীবিত করা হলো। ডা. আহমদ জামানকে সভাপতি, কাজী জাফর আহমদকে সাধারণ সম্পাদক এবং আমাকে ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক করা হলো। পরের বছর ১৯৬৩ সালে আমি অবশ্য ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই।

১৯৬৬ সালে টঙ্গীতে শ্রমিকদের সঙ্গে চার বছর ছিলেন। এটি কিভাবে সম্ভব হয়েছিল?

শ্রমিক আন্দোলন করব, লাল ঘাঁটি তৈরি হবে, এটা ঢাকা বসে কিভাবে সম্ভব—এমন চিন্তা থেকে তখন চলে যাই। ওই চার বছর আমি বেশির ভাগ সময় আন্ডারগ্রাউন্ডে ছিলাম। পুলিশের ভয়ে একেক দিন একেক জায়গায় থাকতে হতো। নীলপাড়া, আউশপাড়াসহ অনেক জায়গায় শ্রমিকদের সঙ্গে থাকতে হয়েছে।

আপনার পরিবার ওই ঘটনাকে সমর্থন করেছিল?

পরিবার আমাকে সব সময় সমর্থন দিয়েছে।

টাকা-পয়সার সমস্যা ছিল। আমি তখন চাকরিও করি না। বাবাও যে খুব বেশি ধনাঢ্য ছিলেন তা নয়। বাবা তখন তিন হাজার টাকা বেতন পেতেন। সুবিধা ছিল আমরা মাত্র দুই ভাই। বিলাসিতা ছিল না। বিয়েও তখন পর্যন্ত আমি করিনি।

বিয়ে কবে করলেন?

স্বাধীনতার পরে ৩০ বছর বয়সে আমি বিয়ে করি। অবশ্য ওই বিয়েটা শেষ পর্যন্ত টেকেনি। একটি মেয়ে আছে আমার। নৃবিজ্ঞানে পিএইচডি করে সে এখন কানাডায় আছে। স্বামী ও তিন পুত্রসহ কানাডায় বসবাস করছে।

এখানে আপনার দেখাশোনা করেন কে?

কষ্ট হয় না?

হা হা হা। এরই মধ্যে আমি পাঁচ-সাতবার হাসপাতাল ঘুরে এসেছি। হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পর প্রথমে কিছুদিন খালাতো বোনের বাসায় ছিলাম। ওখানে ঠাণ্ড বেশি, তাই এ বাসায় চলে এসেছি। এরপর আমার ভাইয়ের মেয়ে দেখাশোনা করত।

এখন শ্রমিক আন্দোলনে আত্মনিবেদন দেখেন?

এখন তো শ্রমিক আন্দোলন ওইভাবে নেই। একমাত্র সিপিবির ট্রেড ইউনিয়ন ফ্রন্টের; তাও শুধু গার্মেন্ট সেক্টরে। বাকি সব হয় এনজিও, নয়তো দালালি ইত্যাদি।

বৈশ্বিক কারণেও কি শ্রমিক আন্দোলনে পরিবর্তন এসেছে?

এটি সত্যি নয়। বরং (শ্রমিক আন্দোলন) তীব্রতর হয়েছে। এত কিছুর পরও ভারতে বড় বড় রেল ধর্মঘট হয়েছে। কোরিয়া ও ফিলিপাইনে বড় ধরনের শ্রমিক আন্দোলন হচ্ছে। তবে এটি বলতে পারেন যে মধ্যবিত্তের মধ্যে ভোগ-বিলাসিতার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে। মধ্যবিত্তের ভোগবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণে শ্রমিকদের উন্নতি হয়নি।

শ্রমিক আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা কি কমে গেছে?

মানুষের অবস্থার উন্নতির কারণে শ্রমিক আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশে কমে গেছে—কথাটা সঠিক নয়। কারণ আমাদের দেশের শ্রমিকরা এখন যে বেতন পায়, তা খুবই কম বা অনেক ক্ষেত্রে পায় না। যে কারণে গার্মেন্ট সেক্টরে ঘন ঘন আন্দোলন হচ্ছে।

চীনরাশিয়ায় বিপ্লব তো শ্রমিকদের কারণেই সম্ভব হয়েছিল?

সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের অনেক আগেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শ্রমিক আন্দোলন শুরু হয়েছে। সেই শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে সমাজতন্ত্রের বীজ ঢুকিয়ে দিয়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সফল হয়েছে। আদমজী, খুলনার জুট মিলগুলো এবং টেক্সটাইল বন্ধ হওয়ার পরও বাংলাদেশে শ্রমিক সংখ্যা বেড়ে এখন প্রায় ৫০ লাখ হয়েছে। সেখানে মাঝেমধ্যেই বিস্ফোরণ ঘটছে। আরেকটি ব্যাপার হলো; আগে শ্রমিক আন্দোলনের প্রতি সমাজের অনেক মানুষ সহানুভূতিশীল ছিল। কিন্তু এখন কোনো আন্দোলনেই মানুষের সহানুভূতি পাওয়া যায় না। এর একটা কারণ হতে পারে, সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণির আয় বেড়েছে। এর সঙ্গে তৈরি হয়েছে ভোগবাদ।

শুধু শ্রমিক আন্দোলন নয়সব ক্ষেত্রেই তো ডেডিকেশনের অভাব

এটা হয়েছে দুটি কারণে। প্রথমত, সরকারের ভয়। এখন কথায় কথায় মানুষ যেভাবে গুম হচ্ছে এটি আগে ছিল না। দ্বিতীয়ত, আমরা সবাই অর্থাৎ জাতি হিসেবে বাঙালি নির্যাতিত হওয়ায় পাকিস্তানের প্রতি আমাদের সবার এক ধরনের আক্রোশ ছিল। ফলে যারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে তাদের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ ছিল। যে মালিকদের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করেছিলাম তাদের ৯০ শতাংশ ছিল অবাঙালি।

মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে আসি। কিভাবে অংশ নিলেন?

মুক্তিযুদ্ধ হবে এবং পাকিস্তানিদের তাড়াতে হবে এমন উপলব্ধি তখন বামপন্থীদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের একটা অংশ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যেও ছিল। সিরাজুল আলম খান ও শেখ মণিসহ আওয়ামী লীগের তরুণ নেতাদের মধ্যেও ছিল। তবে খন্দকার মোশতাক ও সালাম খানসহ আওয়ামী লীগের ডানপন্থীদের মধ্যে ওই ভাবনা ছিল না।

দেশের সমাজতন্ত্রীরা মস্কোপন্থী  পিকিংপন্থী কিভাবে হলেন?

সময়টা হলো ১৯৫৬ সাল। ক্রুশ্চেভপন্থীদের অবস্থান তখন অনেক পাল্টে গেছে। তারা এমন এক লাইন বা অবস্থান গ্রহণ করল, যাতে পুঁজিবাদের অনুপ্রবেশ ঘটে। চীনপন্থীরা বলেন, তোমরা লেনিন ও স্টালিনের পথ থেকে সরে গেছ। এ নিয়ে অনেক বিতর্কের পর ১৯৬০ সালে মস্কোতে ৮১ পার্টির কংগ্রেস অনুুষ্ঠিত হয়। যেখানে আমাদের তখনকার অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন গোপাল নাগ। তিনি চীনের পার্টি সমর্থন করেন। কিন্তু এখানের মণি সিংহসহ কেউ কেউ সমর্থন করেছেন সোভিয়েত লাইন। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত ধামাচাপা দিয়ে দুই পক্ষ মিলে ওই ৮১ পার্টির নেতারা একত্রে বসে একটি দলিলে স্বাক্ষর করে; যা ৮১ পার্টির দলিল নামে পরিচিত। কিন্তু এই আপসরফার দলিল পরবর্তীকালে টেকেনি। পরে চীন ও সোভিয়েত পার্টির মধ্যে লেটার অব এক্সচেঞ্জ হয় সাতবার। ১৯৬৩ সালের ১৪ জুলাই চীনের পার্টি যে চিঠি লিখেছিল তার মর্মবস্তুর আলোকে আমরা আমিসহ আরো অনেকে সঠিক বলে মনে করে চীনা লাইন সমর্থন করি। আজকের বাস্তবতা হলো, চীন সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। আর সেভিয়েতে তো কমিউনিস্ট পার্টিই নেই।

সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি নিজে শেষ হয়ে  পৃথিবীর সমাজতন্ত্র ধ্বংস করে দিল?

হ্যাঁ, পৃথিবীর বহু দেশে কমিউনিস্ট পার্টি বিলুপ্ত হলো। আমাদের দেশেও হলো। এখানকার মস্কোপন্থী পার্টির প্রেসিডেন্ট সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক এবং সেক্রেটারি নুরুল ইসলাম নাহিদ থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বলল যে মার্ক্সবাদেরই দরকার নেই। এখনো এসব নিয়ে তত্ত্ব ও বিতর্ক চলছে।

আপনি  রাশেদ খান মেনন চীনপন্থার দিকে চলে এলেন?

১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যেই আমরা ওখান থেকে বেরিয়ে এসে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি গঠন করি। গণ-অভ্যুত্থানেও আমরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করি। আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, মোস্তফা জামাল হায়দারসহ আরো অনেকে আমাদের সঙ্গে ছিলেন। হ্যাঁ, আমরা চীনপন্থীদের সঙ্গে থাকলাম। মস্কোপন্থীদের মধ্যে প্রধান নেতা ছিলেন মণি সিংহ।

মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার গল্পটি শেষ হয়নি….

১৯৭১ সালে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি এই নামে আমরা যুদ্ধ করেছিলাম। আমরা আরো কিছু ছোটখাটো বামদের জড়ো করে মওলানা ভাসানীকে প্রধান করে ‘বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি’ ফ্রন্ট গঠন করি। সেই ফ্রন্টের ড্রাফটটি আমি তৈরি করেছিলাম। ওদিক থেকে কলকাতার বেলেঘাটায় তখন মিটিং হয়েছিল, বড়দা চক্রবর্তী ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। তখন কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মাওবাদী-সিপিআইএম) আমাদের সমর্থন করেছিল এবং সিপিআই মস্কোপন্থীদের সমর্থন করত। যুদ্ধ সবচেয়ে বেশি করেছে পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি। আমাদের ১৪টি ঘাঁটি ছিল। মুক্ত এলাকা ছিল ১৪টি। ভারতের কোনো সাহায্য আমরা পাইনি। বরং ভারতের বাধা পেয়েছি। সশস্ত্র সৈনিক ছিল ৩০ হাজারের ওপরে। এক শর বেশি লোক আমাদের শহীদ হয়েছেন।

ভারতের বিরোধিতা আপনারা চীনপন্থী হওয়ার কারণে?

হ্যাঁ, চীনপন্থী হওয়ার কারণে। সে অনেক কাহিনি। ভারতীয়রা আমাদের ধরে নিয়ে গিয়েছিল। সংক্ষেপে বলতে গেলে মুক্তিযুদ্ধে আমাদের ১৪টি ঘাঁটির মূল ঘাঁটি ছিল নরসিংদীর শিবপুরে। কলকাতা ও আগরতলায় আমরা দুটি বিদেশি ঘাঁটি রেখেছিলাম। কারণ তখনকার পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম থেকে দিনাজপুরে যোগাযোগ করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু ভারতের মাটি ব্যবহার করে দিনাজপুরের কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব ছিল। আমি, রাশেদ খান মেনন এবং কাজী জাফরের এলাকা ভাগ করে দায়িত্ব দেওয়া ছিল। প্রধান দায়িত্ব ছিল আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার ওপর।

শিবপুরে সাদেক হোসেন খোকা কী আপনাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেনমেনন ভাই এক লেখায় বলেছেনতিনি  খোকা একটি ভাঙা জিপ গাড়িতে করে নরসিংদী যেতেন!

সেটি যুদ্ধের আগেকার ঘটনা। যুদ্ধ সংঘটিত করার জন্য তাঁরা নরসিংদী যেতেন। যুদ্ধ শুরু হলে আমরা শিবপুরে যার গাড়িতে করে গিয়েছিলাম তিনি হলেন জহির রায়হান। তিনি আমাদের দল করতেন। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ ঢাকা পল্টন ময়দানে সর্বশেষ যে সমাবেশটি হয়, সেখানে দুই লাখ লোক সমবেত হয়েছিল, সেটি আমরা করেছিলাম। সে রাতেই ক্র্যাকডাউন হয়, যা আগে থেকে আমরা জানতাম না।

যুদ্ধের পর দেশে ফিরলেন কখন?

ছোট ভাই জুনো তখন দেশেই ছিল। ১৬ ডিসেম্বরের দুদিন আগে তারা নরসিংদী দখল করল। ঢাকায় ফিরে আসে সে ১৮ ডিসেম্বর। চার দিন পর ২০ ডিসেম্বর আমি ও কাজী জাফর আহমদ দেশে ফিরলাম। মেনন ফিরেছেন সপ্তাহ খানেক পরে।

যুদ্ধের পরপরই আপনার  বঙ্গবন্ধু পরিবারকেন্দ্রিক একটি ঘটনা ছিল….

১৬ ডিসেম্বর দুপুরে বিজয় উদযাপন করতে ডোরা নামের আমার এক খালাতো বোন আমাদের বাড়িতে আসেন। ওঁর গাড়িতে করেই আমার পরিবারের সদস্যরা ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে দেখতে যায়। সেখানে থাকা পাকিস্তানি সেনারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই গুলি করে বসে। তখন পাকসেনাদের দলটি বাড়িটি পাহারায় ছিল। ঘটনাচক্রে ওই সেনারা তখনে আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করে। তাদের গুলিতে ঘটনাস্থলেই সেই খালাতো বোন মারা যান। একটা গুলি আমার ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর মাথার চামড়া ছিঁড়ে বেরিয়ে যায়। অল্পের জন্য সে রক্ষা পায়। গুলি আমার মায়ের হাতের ভেতর দিয়ে গিয়ে কাঁধের ভেতরে ঢুকে। গুলিটি আর বের করা সম্ভব হয়নি। পরে আমাকে বঙ্গবন্ধুর মা জানিয়েছিলেন, গুলির শব্দে তিনি ‘কী করছ, কী করছ’ বলে এগিয়ে যান। বঙ্গবন্ধুর মা বলেন, ‘আমি জানতে পারলাম যে ওখানে রনোর মা আছে। আমি পানি নিয়ে আসতে চাইলে আমার বুকে পাকসেনারা রাইফেল ধরে বলে, খবরদার, সামনে আসবে না!’

শেখ হাসিনা  খালেদা জিয়া দুজনই আপনার বাসায় এসেছেন বলে শুনেছি।

আমার মা ও বাবা দুজনই মারা যাওয়ার পর শেখ হাসিনা এ বাড়িতে এসেছিলেন। মা মারা যাওয়ার পর এসে তিনি প্রায় এক ঘণ্টা ছিলেন। এ বাড়িতে মওলানা ভাসানীও এসেছেন। স্বাধীনতার পর খালেদা জিয়াও এসেছেন। তাঁর ভাই সাঈদ এস্কান্দার আমাদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন।

বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাসহ নানা কারণেই আপনি চাইলে মন্ত্রী হতে পারতেন

আমি যে আদর্শের রাজনীতি করছি তার সঙ্গে মন্ত্রিত্বের সুবিধা গ্রহণ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করি। যেসব বামপন্থী মন্ত্রী হয়েছেন তাঁরা আদর্শের সঙ্গে বেইমানি করেছেন। তাঁরা দেশের উপকারের জন্য মন্ত্রী হননি।

ওয়ার্কার্স পার্টিতে থাকতে পারলেন না কেন?

আমি, কাজী জাফর এবং মেনন প্রায় সারা জীবন একসঙ্গে ছিলাম। কাজী জাফর জিয়াউর রহমানের সঙ্গে চলে গেলেন। তাঁর কিছুদিন পরে মান্নান ভূঁইয়া বিএনপিতে চলে গেলেন। আমি আর মেনন রয়ে গেলাম। কিন্তু ২০০৯ সালে ১৪ দল করে মেনন নৌকা মার্কায় নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেন। কমিউনিস্ট পার্টি হিসেবে তাঁর ওই অবস্থানের সঙ্গে আমি একমত হতে পারিনি।

নেতাদের বুর্জোয়াসখ্য  মন্ত্রিত্ব গ্রহণ বাম ধারাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে?

অবশ্যই। আবার সবাই যে যায়নি এটিও ঠিক। পৃথিবীর ইতিহাসে অবশ্য বামপন্থী বা কমিউনিস্টদের বিট্রেয়ালের (বিশ্বাসঘাতকতা) এই ঘটনা নতুন নয়। ট্রটস্কির মতো লোক বিট্রে করেছেন।

বাংলাদেশের বামপন্থীরা এক হতে পারছেন না কেন?

সবাই চান যে আমি নিজেই একটা দলের নেতা হব, এ কারণে।

বামরা জনগণের আস্থা কেন অর্জন করতে পারছে না?

প্রথমত, বামপন্থীরা বড় রকমের ভুল করেছে। দ্বিতীয়ত, বামের বড় বড় নেতা বিট্রে করেছেন। যেমন—মণি সিংহের মতো নেতা যদি বলেন যে আওয়ামী লীগ বা শেখ মুজিবের দ্বারা সমাজতন্ত্র হবে, তাহলে জনগণ তো তাঁর (মুজিবুরের) দলেই যাবেন। আমাদের সময়কার সবচেয়ে যোগ্য, প্রতিভাবান ও সম্মোহনী ক্ষমতাসম্পন্ন নেতা ছিলেন কাজী জাফর। মেনন এ দেশের রাজনীতিতে একটা বড় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। আমরা একে একে সবাইকে হারালাম।

দেশে তৃতীয় ধারা কেন গড়ে উঠছে না?

বামপন্থীরা ঐক্যবদ্ধভাবে সে রকম শক্তি ও ডেডিকেশন নিয়ে দাঁড়াতে পারলে আমরা তৃতীয় শক্তি হতে পারতাম। সেই নেতৃত্বেরও অভাব রয়েছে। তার পরও মনে করি, শক্তি একসময় কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বেই হবে।

আপনাদের  এখনকার রাজনীতির তফাত?

আমাদের সময়ে মূল বিষয়টি ছিল পাকিস্তানের স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতন ঘটিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করা। কৃষক শ্রমিক অস্ত্র ধরো পূর্ব বাংলা স্বাধীন করো—এই ছিল আমাদের ব্রত। কিন্তু এখন সেই ব্যাপারটি নেই। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন করা যত সহজ, শ্রেণি-সংগ্রাম তত সহজ নয়।

ধানমণ্ডি, ঢাকা, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *