News

পঞ্চগড়ে খাল খননে অনিয়ম/দুই হাজারের পাইপ ১৩ হাজার, গাছপ্রতি খরচ ৬৭৯

পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার বাকডোকরা খাল খনন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। দায়সারা খনন, কালভার্ট নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং শ্রমিক দিয়ে কাজ করানোর নিয়ম থাকলেও এক্সকাভেটর (ভেকু) দিয়ে মাটি কাটাসহ প্রকল্পজুড়ে নানা অনিয়মের সত্যতা মিলেছে। বিশেষ করে একটি গাছের পেছনে ৬৭৯ টাকা, বাজারমূল্য দুই হাজার টাকার আরসিসি রিং পাইপের দাম ১৩ হাজার ৪৭৯ টাকা দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি কালভার্ট নির্মাণ ব্যয় ৯ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১৬ লাখ টাকা করা এবং প্রকল্প কমিটির স্বাক্ষর ছাড়াই বিল উত্তোলনের মতো ঘটনা ঘটেছে।

বিএনপি সরকারের বিশেষ উদ্যোগে নদী, খাল ও জলাশয় খনন কর্মসূচির অংশ হিসেবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অধীন আটোয়ারী প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের মাধ্যমে আলোয়াখোয়া ইউনিয়নের বাকডোকরা খাল খননের উদ্যোগ নেয় উপজেলা প্রশাসন। চলতি বছরের ৮ মে বাকডোকরা কুলাডাঙ্গী পুল হতে পশ্চিমে আব্বাস আলীর জমি পর্যন্ত ৬০৫ মিটার খাল খননের উদ্বোধন করা হয়। দুটি কালভার্ট নির্মাণ, পাইপ স্থাপন ও বৃক্ষরোপণসহ প্রকল্পটিতে মোট ৫১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৯৫ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

আটোয়ারী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য মতে, শ্রমিকদের মাধ্যমে খননে ২৫ লাখ ৬২ হাজার ৮০০ টাকা, এক্সকাভেটর দিয়ে খননে ৩ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, আরসিসি পাইপ স্থাপনে ৬ লাখ ৪৭ হাজার টাকা, কালভার্ট নির্মাণে ১০ লাখ ৫০ হাজার ৮৫০ টাকা, ঘাস লাগানোয় ৭৬ হাজার ৩৮১ টাকা এবং গাছ রোপণের জন্য ৪ লাখ ৬১ হাজার ৬০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে প্রকল্পের দুটি কালভার্টের বরাদ্দ পরবর্তীতে বাড়িয়ে ১৬ লাখ ৫৭ হাজার টাকা করা হয়।

প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, এক হাজার ১৫৪টি বৃক্ষ রোপণের কথা থাকলেও বাস্তবে রোপণ করা হয়েছে মাত্র ৬৮০টি; যাতে প্রতিটি গাছে গড়ে ব্যয় হয়েছে ৬৭৯ টাকা। অন্যদিকে ১৯৬টি আরসিসি রিং পাইপ স্থাপনের কথা থাকলেও ২২টি স্থানে স্থাপন করা হয়েছে মাত্র ৪৮টি। এসব রিং পাইপের প্রতিটির বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা হলেও এখানে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৩ হাজার ৪৭৯ টাকা। ১১৯ জন শ্রমিককে প্রতিদিন ৫০০ টাকা করে হাজিরা দেওয়ার পরও ঘাস লাগানো খাতে বাড়তি ব্যয় দেখানো হয়েছে ৭৬ হাজার ৩৮১ টাকা। এছাড়া খালের পারাপারে ৮ মিটার দৈর্ঘ্য ও ২ মিটার প্রস্থের দুটি কালভার্ট নির্মাণে প্রথমে ১০ লাখ ৫০ হাজার ৮৫০ টাকা ব্যয় ধরা হলেও পরবর্তীতে তা বাড়িয়ে করা হয় ১৬ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। একই সঙ্গে কালভার্ট নির্মাণে ১৬ মিলি রডের পরিবর্তে ১২ মিলি রড এবং মাটি ও আবর্জনা মিশ্রিত নিম্নমানের খোয়া ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি খালের পশ্চিম অংশে পানিনিষ্কাশনের পথ খোলা না রেখে খালের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই স্থানে আগে কোনো খাল না থাকলেও নকশায় খাল দেখানো হয়েছে। এমনকি খাল খননের বেশিরভাগ কাজ শ্রমিকদের দিয়ে করানোর কথা থাকলেও শুরুতেই এক্সকাভেটর মেশিন দিয়ে বেশিরভাগ কাজ শেষ করা হয়। পরে চালানো হয় শ্রমিক দিয়ে লোকদেখানো দায়সারা খনন। এছাড়া প্রকল্পের শুরুতে একটি কালভার্ট নির্মাণের কথা থাকলেও পরবর্তীতে সংশোধন করে আরেকটি কালভার্ট যুক্ত করা হয়। কালভার্ট ব্যবহারে নিম্নমানের ইট ও রড দেওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অভিযোগ পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিপামণি দেবী কাজ বন্ধ রেখে তদন্তের নির্দেশ দেন এবং উপজেলা প্রকৌশলী মো. ফয়সালকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করেন। খাল খননে স্থানীয়দের জমি অধিগ্রহণের কথা থাকলেও তা করা হয়নি। এই খাল এখন তাদের কাছে পানিপ্রবাহের বদলে গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তফা কামাল বলেন, এই খাল খননের শুরু থেকেই অনিয়ম হয়ে আসছে, ঠিকমতো কাজ হয়নি। এই খাল এখন আমাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কালভার্টের কাজ হচ্ছে ইটের গুঁড়ো দিয়ে। এভাবে কাজ হওয়ায় কিছু মানুষের পকেটে টাকা ঢুকলেও সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

কাজল নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, এসএ খতিয়ানে সেখানে কোনো খাল ছিল না। বর্তমানে আরএস খতিয়ানে খাল দেখানো হয়েছে এবং সেই নালাকে খালের নাম দিয়ে খনন করা হয়েছে। এই খাল খনন করায় আমাদের ৯০ শতাংশ মানুষের ক্ষতি হয়েছে। খননের মাটি আমাদের জমির ওপর ফেলা হয়েছে। খালে পানি তো থাকবেই না, উল্টো ক্ষেতের পানি নেমে খালে আসবে।

শুধু বাড়তির খরচই নয়, প্রকল্পে ৭ সদস্যের একটি কমিটি রাখা হলেও তাদের দাবি—প্রকল্পের বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না। কমিটিতে যাদের রাখা হয়েছে তাদের বেশিরভাগই স্থানীয় বিএনপি নেতা ও সমর্থক। এর মধ্যে আতাউর রহমান নামের একজন কম্পিউটার প্রদর্শক হলেও তাকে দেখানো হয়েছে ‘শিক্ষক প্রতিনিধি’। এছাড়া স্থানীয় এক ব্যক্তি মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তাকে ‘ইমাম’ হিসেবে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে তারা জানেন না কী প্রক্রিয়ায় কাজ সম্পন্ন হচ্ছে। এমনকি প্রকল্পের টাকা উত্তোলনে তাদের স্বাক্ষরও নেওয়া হয়নি।

প্রকল্প কমিটির সদস্য ময়না বেগম বলেন, আমাকে না জানিয়ে কমিটিতে রাখা হয়েছে। কাজ করার কথা ছিল শ্রমিক দিয়ে, কিন্তু কাজ করা হচ্ছে ভেকু মেশিন দিয়ে। শুনেছি ১১৯ জন শ্রমিকের তালিকা করা হয়েছে, যারা মূলত চেয়ারম্যান ও দলীয় লোক।

প্রকল্পের সভাপতি ও আলোয়াখোয়া ইউনিয়নের সংরক্ষিত ইউপি সদস্য করুনা রানী পাল বলেন, আমার মা অসুস্থ থাকায় আমি বগুড়ায় আছি। যেখানে যেখানে সই লেগেছে, আমি সই করে দিয়ে চলে এসেছি। বাকি সবকিছু করছেন চেয়ারম্যান। কোথায় কী কাজ হয়েছে, ভালো না মন্দ—আমি কিছুই জানি না।

আটোয়ারী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ফজলুল হক বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ীই কাজ করছিলাম। কালভার্ট নির্মাণে এক ট্রলি নিম্নমানের ইটের খোয়া আনা হয়েছিল, সেটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের ৪৩ দিনের কাজ শেষ হয়েছে এবং তারা পেমেন্ট পেয়ে গেছে। তদন্তের কারণে বর্তমানে কাজ বন্ধ আছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিপামণি দেবী বলেন, অনিয়মের অভিযোগ পেয়ে আমরা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছি। তদন্ত প্রতিবেদন পেলেই প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

source: Asia Post

Back to top button