নির্বাচনের আগে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার মরিয়া চেষ্টা নেতানিয়াহুর

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সরকার জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে একের পর এক বিতর্কিত আইন পাস করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব আইনের উদ্দেশ্য নির্বাহী বিভাগের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করা এবং ডানপন্থি ও অতি-রক্ষণশীল ধর্মীয় জোটকে আরও সুসংহত করা।
গত ১৭ জুলাই চার বছরের পূর্ণ মেয়াদ শেষ করে আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে যায় ইসরায়েলের আইনসভা নেসেট। তবে ভেঙে যাওয়ার আগে শেষ সপ্তাহে সরকার যেসব আইন পাস করেছে, সেগুলোকে ইসরায়েলি বিশ্লেষকরা ‘লেজিসলেটিভ ব্লিটজ’ বা ‘আইন প্রণয়নের ঝড়’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
কোন কোন আইন পাস হয়েছে?
সরকারের পাস করা গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলোর মধ্যে রয়েছে— সরকারের সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের বাধ্যতামূলক মতামতের ক্ষমতা সীমিত করা।
তোরাহ অধ্যয়নকে রাষ্ট্রের মৌলিক মূল্যবোধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে নতুন বেসিক আইন পাস।
বাধ্যতামূলক সামরিক ডাকে সাড়া না দেওয়া অতি-রক্ষণশীল ইহুদিদের (হারেদি) গ্রেপ্তার সাময়িকভাবে স্থগিত।
গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে সম্প্রচার নিয়ন্ত্রক সংস্থায় সরকারের প্রভাব বাড়ানো।
বিচার বিভাগের সঙ্গে সংঘাত
আঙ্কারাভিত্তিক সেন্টার ফর মিডল ইস্টার্ন স্টাডিজের গবেষক গোকহান বাতু বলেন, নেতানিয়াহুর এই আইন প্রণয়নের মূল লক্ষ্য বিচার বিভাগের ক্ষমতা খর্ব করা।
তার ভাষায়, সরকারি জোটের সবচেয়ে বড় ঐক্য বিচার বিভাগীয় সংস্কারের প্রশ্নে। বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্ট ও অ্যাটর্নি জেনারেলের ক্ষমতা সীমিত করার বিষয়ে তারা একমত।
তিনি বলেন, কার্যত বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে সরকার।
বর্তমান ব্যবস্থায় ইসরায়েলের অ্যাটর্নি জেনারেল সরকারের সিদ্ধান্ত আইনসম্মত কি না, সে বিষয়ে বাধ্যতামূলক মতামত দিতে পারেন।
নতুন আইনের ফলে মন্ত্রীরা চাইলে সেই মতামত উপেক্ষা করতে পারবেন। পাশাপাশি অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষমতাও সরকার নিজের হাতে নিতে পারবে। বর্তমানে এ দায়িত্ব একটি স্বাধীন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়।
গণতন্ত্রের জন্য ঝুঁকি
ইসরায়েলের লিখিত সংবিধান নেই। ফলে সুপ্রিম কোর্টই নির্বাহী বিভাগের ওপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বিচার বিভাগের ক্ষমতা কমে গেলে সরকারের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
গোকহান বাতু বলেন, এর ফলে বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়বে।
নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক কৌশল
জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর জোট পিছিয়ে থাকায় নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, ডানপন্থি ও অতি-রক্ষণশীল ধর্মীয় দলগুলোর সমর্থন ধরে রাখতে সরকার এসব আইন দ্রুত পাস করেছে।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির বিচারও এই রাজনৈতিক পদক্ষেপের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
তাদের মতে, বিচার বিভাগের ক্ষমতা সীমিত হলে নেতানিয়াহুর জন্য আইনি চাপ কমতে পারে। ফলে এই আইনগুলো কেবল নীতিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং ক্ষমতায় টিকে থাকার রাজনৈতিক কৌশলের অংশ বলেই অনেকে মনে করছেন।
বিরোধীদের সমালোচনা
বিরোধী দল ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লিখিত সংবিধান ও দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা না থাকায় ইসরায়েলে অ্যাটর্নি জেনারেলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই ক্ষমতা কমিয়ে দিলে গণতান্ত্রিক ভারসাম্য নষ্ট হবে।
এ ছাড়া হারেদি সম্প্রদায়ের বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ তৈরি করায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে গাজা, লেবানন ও ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাতে সাধারণ ইসরায়েলিদের বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব আইন নির্বাচনের ফল এককভাবে নির্ধারণ করবে না। তবে নেতানিয়াহু যে রাজনৈতিকভাবে কঠিন সময় পার করছেন এবং ক্ষমতায় টিকে থাকতে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা করছেন, এই আইনগুলো সেই বাস্তবতাই স্পষ্ট করে তুলেছে।
source: Asia Post







