অডিট আপত্তির মুখে পড়া অধ্যক্ষকেই ডিআইএর শীর্ষ পদে বসাল মন্ত্রণালয়

যোগদানের মাত্র দেড় মাসের মাথায় প্রায় এক লাখ টাকার ব্যয় নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) অডিট আপত্তির মুখে পড়েন চাঁদপুরের কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আফলাতুন। সেই অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই তাকেই ডিআইএর শীর্ষ (পরিচালক) পদে নিয়োগ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ একজন অধ্যক্ষকে এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসানোর সিদ্ধান্ত ঘিরে শিক্ষা প্রশাসনে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
গত ২৩ জুলাই ডিআইএর পরিচালক পদে পদায়ন পান অধ্যাপক মো. আফলাতুন। তাকে এ পদে পদায়নের এক মাস আগে অর্থাৎ জুনের শুরুতে কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজের নানা অনিয়ম নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয় ডিআইএ।
শুধু তাই নয়; এই পদায়নের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতাও লঙ্ঘন করা হয়েছে। কেননা প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান যুগ্ম পরিচালক প্রফেসর মো. ইদ্রিস আলী শিক্ষা ক্যাডারের ১৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা। আর পরিচালক হিসেবে পদায়ন পাওয়া আফলাতুন ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তা। জ্যেষ্ঠতা ডিঙ্গিয়ে এই পদায়ন ঘিরে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে।
‘শিক্ষা প্রশাসনে সব সময় পরিস্কার লোক আসবে সেটাই প্রত্যাশা করি। যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নেই; এমন ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা দরকার। অধ্যক্ষ আফলাতুনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে সেটি যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে এই পদায়ন করে মন্ত্রণালয় অন্যায় করেছে। একটি নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত স্থাপন হলো’—অধ্যাপক মজিবুর রহমান, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কচুয়া সরকারি কলেজের বইপত্র ও সাময়িকী, মুদ্রণ ও মনিহারি সামগ্রী এবং গবেষণার সরঞ্জামাদি ক্রয়ের ক্ষেত্রে ৭৭ হাজার টাকা ব্যয়ের ভাউচার দেখিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। তবে এর বিপরীতে ক্রয়কৃত জিনিস দেখাতে পারেনি। অধ্যাপক মো. আলফাতুন কচুয়া কলেজে যোগদানের দেড় মাসের মাথায় এগুলো ক্রয় করা হয়েছে। বিষয়টি সরাসরি অধ্যক্ষের তত্বাবধানে হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ১১ মে কোন ধরণের চাহিদাপত্র ছাড়াই ২০ হাজার ৩০০ টাকার বই ক্রয়ের ভাউচার জমা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পূর্বের বই ক্রয়ের ভাউচারে মোট ক্রয়মূল্যের উপর কমিশন বাদ দেওয়ার প্রবণতা থাকলেও এই ক্রয়কার্যে তা অনুপস্থিত ছিল। উপরন্তু লাইব্রেরির একসেশন রেজিস্টার পর্যবেক্ষণ করে বইসমূহ ক্রয়ের কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং বইসমূহ কেউ বুঝে পায়নি মর্মে নিশ্চিত হয়েছে ডিআইএ।
অডিট প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, কলেজের হিসাবরক্ষণ অফিসের ২০২৬ সালের ১৯ মে ৬৫ নম্বর ভাউচার অনুযায়ী ৩৫ হাজার ৪০০ টাকার ছোট খাম, বড় খাম, কলেজের প্যাড ছাপানোসহ অন্যান্য দ্রব্যাদি ক্রয়ের ভাউচার দাখিল করা হয়েছে। কিন্তু নিরীক্ষাকালে উক্ত সামগ্রী ছাপানোর জন্য কোন চাহিদাপত্র পাওয়া যায় নি। পূর্বে এ জাতীয় অনেক খাম ছাপানো স্বত্বেও কতটুকু খামের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে তা নিশ্চিত না করেই সামগ্রীসমূহ ছাপানো হয়েছে। স্টক রেজিস্টারে উক্ত সামগ্রী এন্ট্রি করা হয়নি এবং উক্ত মালামাল কেউ বুঝে পাইনি মর্মে নিশ্চিত হয়েছে। এ টাকা বিধি-বহির্ভূত ব্যয় করা হয়েছে।
তথ্য বলছে, কচুয়া সরকারি কলেজের হিসাবরক্ষণ অফিসের ২০২৬ সালের ১৯ মের ৭৪ নম্বর ভাউচার অনুযায়ী ১৮ মে ৩৫ হাজার টাকার একটি আলমারি ক্রয়ের ভাউচার দাখিল করা হয়েছে। নিরীক্ষাকালে দেখা যায়, কোন ধরণের চাহিদাপত্র ছাড়া উক্ত আলমারিটি ক্রয় করা হয়েছে। গবেষণার সরঞ্জামাদি খাতের অর্থ দিয়ে আসবাবপত্র (আলমারি) ক্রয় বিধিসম্মত নয়। উপরন্তু, সরেজমিনে উক্ত সামগ্রী ক্রয়ের কোন প্রমাণ পায়নি ডিআইএ। এছাড়া আলমারিটি কেউ বুঝে পায়নি মর্মে নিশ্চিত হয়েছে ডিআইএ।
‘যারা প্রশ্নবিদ্ধ বা যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পদায়ন না করাই সমীচীন। ডিআইএ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়ম নিয়ে কাজ করে। এখন যার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ, তাকেই যদি ওই সংস্থার শীর্ষ পদে বসানো হয়, তাহলে তিনি দুর্নীতিকে আরও প্রশ্রয় দেবেন বলেই আমার মনে হয়’—অধ্যাপক মজিবুর রহমান, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
উপরের তিনটি ক্রয়ের ভাউচারই কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আফলাতুন যোগদানের পর করা হয়েছে। বিধি বহির্ভূতভাবে এসব ক্রয় এবং ক্রয়কৃত জিনিসপত্র দেখাতে না পারার ঘটনায় অধ্যক্ষ মো. আফলাতুন জড়িত রয়েছেন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। ফলে তাকে ডিআইএতে পদায়ন নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অডিদপ্তর যার বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, তাকেই প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ পদে বসানোয় অনিয়ম আরও বাড়বে। এ ধরনের পদায়নের ঘটনা শিক্ষা প্রশাসনে বিরল। বিষয়টি দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া বলে অভিমত তাদের।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘শিক্ষা প্রশাসনে সব সময় পরিস্কার লোক আসবে সেটাই প্রত্যাশা করি। যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নেই; এমন ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা দরকার। অধ্যক্ষ আফলাতুনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে সেটি যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে এই পদায়ন করে মন্ত্রণালয় অন্যায় করেছে। একটি নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত স্থাপন হলো।’
এ শিক্ষাবিদ আরও বলেন, ‘যারা প্রশ্নবিদ্ধ বা যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পদায়ন না করাই সমীচীন। ডিআইএ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়ম নিয়ে কাজ করে। এখন যার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ, তাকেই যদি ওই সংস্থার শীর্ষ পদে বসানো হয়, তাহলে তিনি দুর্নীতিকে আরও প্রশ্রয় দেবেন বলেই আমার মনে হয়।’
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আফলাতুনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
সার্বিক বিষয়ে জানতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেককে কল করা হলে তিনি একটি মিটিংয়ে আছেন জানিয়ে ফোন কেটে দেন।
ডিআইএ পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলামকে সরানো হলো যে কারণে
সম্প্রতি রাজধানীর মনিপুর স্কুল এন্ড কলেজ, মতিঝিল আইডিয়াল কলেজ, সিটি কলেজ, মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজ, মোহাম্মদপুর আল হেরা কলেজ, ধনিয়া কলেজ, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ফরিদপুরের ভাঙ্গার ইকামতে দ্বীন মডেল মাদ্রাসাসহ আলোচিত একাধিক প্রতিষ্ঠান তদন্ত করে ডিআইএ।
এসব প্রতিষ্ঠানে হওয়া অনিয়ম নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২ হাজার ১০০ জাল সনদধারী শিক্ষককে শনাক্ত করে তাদের বেতন-ভাতা বন্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছিল। এতে কেউ কেউ পরিচালকের উপর সংক্ষুব্দ থাকতে পারেন বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে ডিআইএ থেকে বদলি হওয়া পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাকে কী কারণে সরানো হয়েছে, সেটি বলতে পারছি না।’
source: The Daily Campus







