News

এক যুগেও চালু হয়নি ট্রমা সেন্টার, চিঠি চালাচালিতেই সীমাবদ্ধ প্রশাসন

১২ বছর আগে নির্মাণ করা হয় ভবন, ৯ বছর পর উদ্বোধন। এরপর চিকিৎসাসেবা চালু হয়েছিল মাত্র ১৫ দিন। তারপর থেকে বন্ধ রয়েছে হবিগঞ্জের বাহুবল ট্রমা সেন্টার। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা দিয়ে প্রাণহানি কমানোর লক্ষ্যে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে নির্মাণ করা হয়েছিল ১০ শয্যার এই ট্রমা সেন্টার।

তিনতলা ভবন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩ কোটি ১৮ লাখ টাকা। সরবরাহ করা হয়েছে শয্যা ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম। কিন্তু নির্মাণের এক যুগ পেরিয়ে গেলেও স্থায়ীভাবে চালু হয়নি চিকিৎসাসেবা।

জনবল চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠানো এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রেখেছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। সরকারি অর্থে নির্মিত অবকাঠামো ও কেনা চিকিৎসা সরঞ্জাম দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকায় সেগুলো নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালে ফিজিক্যাল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় দেশের ছয়টি মহাসড়কের পাশে ১০ শয্যাবিশিষ্ট ট্রমা সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। এর অংশ হিসেবে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে হবিগঞ্জের বাহুবলেও একটি ট্রমা সেন্টার নির্মাণ করা হয়। প্রায় ৩ কোটি ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০১৪ সালে ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হয়। পরে সেখানে শয্যা ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করা হলেও চিকিৎসাসেবা চালু করা সম্ভব হয়নি। নানা জটিলতায় কেটে যায় আরও কয়েক বছর।

আরো পড়ুন

২০২৩ সালে ট্রমা সেন্টারটির ভবন উদ্বোধন করা হলেও শুরু হয়নি চিকিৎসা কার্যক্রম। পরে ২০২৫ সালের ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে মহাসড়কে মানুষের চলাচল বেড়ে যাওয়ায় সরকারি নির্দেশে জেলার বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে জনবল এনে মাত্র ১৫ দিনের জন্য সেন্টারটি চালু করা হয়। ঈদের পর ওই জনবল নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে গেলে আবারও বন্ধ হয়ে যায় চিকিৎসাসেবা। এরপর স্থায়ীভাবে জনবল পদায়ন না হওয়ায় সেন্টারটি আর চালু করা সম্ভব হয়নি।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের হবিগঞ্জ অংশে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসার জন্য কাছাকাছি কোনো বিশেষায়িত জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্র নেই। ফলে তাদের হবিগঞ্জ, সিলেট কিংবা ঢাকার হাসপাতালে পাঠাতে হয়। এতে চিকিৎসা পেতে গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয়। অনেক ক্ষেত্রে এই বিলম্ব আহত ব্যক্তিদের জীবন আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।

বাহুবলের স্থানীয় বাসিন্দা টিপু সুলতান বলেন, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। এতে অনেকে গুরুতর আহত হন, আবার কেউ কেউ মারা যান। দুর্ঘটনার পর গুরুতর আহত ব্যক্তিদের দ্রুত সিলেট কিংবা ঢাকায় পাঠাতে হয়। কাছাকাছি তাৎক্ষণিক চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় অনেক রোগীর অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, ট্রমা সেন্টারটি চালু থাকলে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হতো। এতে অনেকের জীবন বাঁচানো যেত। এত টাকা ব্যয় করে ভবন নির্মাণের পর সেটি বছরের পর বছর বন্ধ করে রাখা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

স্থানীয় বাসিন্দা ইকবাল মিয়া বলেন, বছরের পর বছর জনস্বার্থে নির্মিত একটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ পড়ে থাকলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। জনবল চেয়ে একের পর এক চিঠি দেওয়া হলেও বাস্তবে সেন্টারটি চালুর কার্যকর উদ্যোগ নেই। এ অবস্থায় প্রশাসনের নীরবতা ও দায়িত্বশীলতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এদিকে সম্প্রতি দেশের ট্রমা সেন্টারগুলোর নাম পরিবর্তন করে ‘অ্যাক্সিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি সেন্টার’ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাহুবলের ১০ শয্যার সেন্টারটি ২০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে।

বাহুবল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুল্লাহেল মারুফ ফারুকী বলেন, সরকারি নির্দেশে জেলার বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে জনবল এনে ২০২৫ সালের ঈদুল আজহায় ১৫ দিনের জন্য সেন্টারটি চালু করা হয়েছিল। এরপর স্থায়ী জনবল না পাওয়ায় এটি আর চালু করা সম্ভব হয়নি। জনবল চেয়ে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়সহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

হবিগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. রত্নদীপ বিশ্বাস এশিয়া পোস্টকে জানান, গত ৯ সেপ্টেম্বর সরকারি পত্রের মাধ্যমে দেশের ট্রমা সেন্টারগুলোর নাম পরিবর্তন করে ‘অ্যাক্সিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি সেন্টার’ করা হয়েছে। বাহুবলের কেন্দ্রটি ১০ থেকে ২০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় কর্মচারীসহ ২৭ জন জনবলের একটি তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও কথা হয়েছে। জনবল পদায়ন করা হলে দ্রুত সেন্টারটি চালু করা হবে।

দীর্ঘ ১২ বছরেও সেন্টারটি চালু করা সম্ভব হয়নি কেন এমন প্রশ্নের জবাবে সিভিল সার্জন বলেন, নানা জটিলতার কারণে এত দিন এটি চালু করা সম্ভব হয়নি। তবে সম্প্রতি সেন্টারটি চালুর বিষয়ে তারা চেষ্টা করছেন।

source: Asia Post

আরো দেখুন
Close
Back to top button