যুদ্ধের ধাক্কায় জীবনযাত্রায় চাপ, ফ্রান্স-ইতালি পেরিয়ে উত্তাল ইউরোপ

জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম, আকাশছোঁয়া বাড়ি ভাড়া, কম মজুরি, শিক্ষাব্যবস্থায় কাটছাঁট আর দুর্বল হয়ে পড়া জনসেবা— ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মানুষের ক্ষোভ এখন রাজপথে। কোথাও আন্দোলনের শুরু শিক্ষা নিয়ে, কোথাও আবাসন সংকট নিয়ে, আবার কোথাও সরাসরি জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ নিয়ে। কিন্তু সবকটির পেছনে একটি অভিন্ন বাস্তবতা— সাধারণ মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে ব্যয়ের ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। আর এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে চলমান যুদ্ধ।
গত কয়েক দিনে ফ্রান্স, ইতালি, বেলজিয়াম, পর্তুগাল, স্পেন ও আলবেনিয়ায় বড় বিক্ষোভ হয়েছে। গ্রিসেও শিক্ষার্থীরা আবাসন ও শিক্ষার ব্যয় নিয়ে অবস্থান নিয়েছে। ইউরোপের সব বিক্ষোভ পরস্পরের সঙ্গে সাংগঠনিকভাবে যুক্ত নয়; স্থানীয় কারণও আলাদা। কিন্তু একই সময়ে এতগুলো দেশে তরুণ, শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও নিম্নআয়ের মানুষের রাজপথে নামা ইউরোপের জীবনযাত্রার সংকটের গভীরতা স্পষ্ট করছে।
ফ্রান্সে সবচেয়ে বিস্ফোরক পরিস্থিতি
বিক্ষোভের ঢেউয়ের সবচেয়ে সহিংস রূপ দেখা গেছে ফ্রান্সে। শুরুতে উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ ক্লাস, শিক্ষক সংকট, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি-প্রক্রিয়ার নানা সমস্যার প্রতিবাদে রাস্তায় নামে। পরে তাদের সঙ্গে যোগ দেয় শ্রমিক সংগঠন ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ।
জ্বালানির দাম বাড়ার বিষয়টি আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও তেলের পরিবহনব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে জ্বালানি বাজারে চাপ বাড়ায় ফ্রান্সে আগে থেকেই থাকা মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতার সংকট আরও প্রকট হয়। শ্রমিক সংগঠন সিজিটি দাম কমানো, মজুরি ও পেনশন বাড়ানোর দাবি সামনে আনে।

শনিবার ফ্রান্স জুড়ে বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেয়। প্যারিসের পাশাপাশি লিওঁ, মার্সেই, লিমোজসহ বিভিন্ন শহরে দোকান, সরকারি স্থাপনা ও অবকাঠামোতে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট হয়। ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, সহিংসতার ঘটনায় প্রায় দুই হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে এবং পুলিশ, জেনদারম (বিশেষ সশস্ত্র বাহিনী) ও দমকল বাহিনীর প্রায় ৬০০ সদস্য আহত হয়েছেন।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের দাবিকে সহিংস গোষ্ঠী থেকে আলাদা করে দেখার কথা বলেছেন। সরকার শিক্ষকদের জন্য অতিরিক্ত ব্যবস্থা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি বাড়ানোর পরিকল্পনা বাতিলের মতো কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু আন্দোলনের অর্থনৈতিক দাবির বড় অংশ এখনো অমীমাংসিত।
ইতালিতে রাস্তায় ক্ষোভ, আহত ১৫০ পুলিশ
ফ্রান্সের পর সবচেয়ে নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ইতালিতে। মিলান, তুরিন, বোলোনিয়া, ব্রেশিয়া ও বার্গামোসহ উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি শহরে জীবনযাত্রার ব্যয়, দুর্বল জনসেবা ও অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়। ইতালিতে মূল্যস্ফীতি, বিশেষ করে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় সাধারণ পরিবারের ওপর অসহনীয় চাপ তৈরি করছে বলে জানিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা।
মিলানে শনিবারের শান্তিপূর্ণ মিছিল রোববার সহিংসতায় রূপ নেয়। মুখোশধারী কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়, দোকান ও সুপারমার্কেটে লুটপাট চালায় এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।

ইতালিতে শনিবারের সংঘর্ষে দেশ জুড়ে ১৪১ পুলিশ সদস্য আহত ও ২৮ জন গ্রেপ্তার হন। পরদিন রোববার কেবল মিলানেই ২৭১ জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাদের মধ্যে ৩২ জনকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার এবং আরও ২৮ জনকে বিচারিক কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্টের মতো ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিও সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন। তবে এ আন্দোলনের পেছনে থাকা অর্থনৈতিক অসন্তোষও অস্বীকার করেননি তিনি।
বেলজিয়ামে শিক্ষা থেকে বাজেটের বিরুদ্ধে ক্ষোভ
বেলজিয়ামে আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছেন মূলত তরুণ ও শিক্ষার্থীরা। ব্রাসেলস ও লিয়েজে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার ব্যয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার এবং শিক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দ কমানোর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছেন।
ব্রাসেলসে শনিবার কয়েক শ তরুণের বিক্ষোভ পুলিশের সঙ্গে মুখোমুখি হলে সংঘর্ষে রূপ নেয়। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। আন্দোলনকারীরা একটি গাড়ি উলটে দেয় এবং বিভিন্ন স্থানে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। লিয়েজেও শিক্ষাব্যবস্থা ও পড়ালেখার উপকরণের বাড়তি ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে।

এর আগে বেলজিয়ামের বড় শ্রমিক ইউনিয়নগুলো সরকারের বাজেট পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ করেছে। তাদের অভিযোগ, বাজেট ঘাটতি কমানোর বোঝা শ্রমিক, পেনশনভোগী ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর চাপানো হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে বৃহত্তর শ্রমিক অসন্তোষও যুক্ত হয়েছে।
পর্তুগালে বাড়িভাড়া যেন আয়ের চেয়ে বড়
পর্তুগালের বিক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে আবাসন। লিসবন, পোর্তোসহ বিভিন্ন শহরে বাড়িভাড়া ও বাড়ির দাম এত বেড়েছে যে তরুণ ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য শহরে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।

শনিবার লিসবনে ১০ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেয়। দেশটির বৃহত্তম শ্রমিক ইউনিয়ন সিজিটিপি এই সমাবেশের ডাক দেয়। বিক্ষোভকারীদের দাবি— মজুরি ও পেনশন বাড়াতে হবে, বাড়িভাড়া ও আবাসন ব্যয় কমাতে হবে এবং সরকারি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে জীবনযাত্রার ব্যয় কমিয়ে আনতে হবে।
আন্দোলনের আরেকটি প্রতীক হয়ে উঠেছে তাঁবু। লিসবনের কেন্দ্রীয় এলাকায় বিক্ষোভকারীরা তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান নেন, যেন আবাসন সংকটের বাস্তবতাটিই রাজপথে তুলে ধরা যায়। পোর্তোতে পুলিশ একটি শান্তিপূর্ণ আবাসন-শিবির সরাতে অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহার করেছে— এমন অভিযোগও উঠেছে।
স্পেনেও আন্দোলনের কেন্দ্রে আবাসন সংকট
স্পেনেও আন্দোলন-বিক্ষোভের কেন্দ্রে আবাসন সংকটের আরেক রূপ— ভাড়া ও উচ্ছেদ। দেশটির বিভিন্ন শহরে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হাজার হাজার মানুষ আবাসন অধিকারের দাবিতে রাস্তায় নেমেছে।
মাদ্রিদের ৮৭ বছর বয়সী মারিয়া দেল কারমেন আবাসন সংকটের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। প্রায় ৭০ বছর ধরে ভাড়া থাকা বাড়িটির মালিকানা পরিবর্তনের পর তার ভাড়া কয়েক গুণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঘটনাটি দেশ জুড়ে ক্ষোভের জন্ম দেয়।

এরপর মাদ্রিদসহ বহু শহরে বড় বিক্ষোভ হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, উচ্ছেদ বন্ধ এবং আবাসিক সম্পত্তি বড় বিনিয়োগ তহবিলের হাতে চলে যাওয়া ঠেকানোর দাবি করছে। সরকারের আবাসন সংস্কারসংক্রান্ত দুটি ডিক্রি পার্লামেন্টে আটকে যাওয়ার পর ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
মাদ্রিদের পুয়ের্তা দেল সলে বিক্ষোভকারীদের অবস্থানও চলছে। সেখানে তাঁবু গেড়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে অবস্থান করছেন আন্দোলনকারীরা। এর মধ্যে স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ আগামী ২৯ নভেম্বর আগাম নির্বাচন ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছেন।
আলবেনিয়ায় অর্থনীতি ছাড়িয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন
আলবেনিয়ার পরিস্থিতি অন্য দেশগুলোর তুলনায় বেশি রাজনৈতিক। তিরানায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দুরবস্থা, উচ্চ শিক্ষাব্যয়, চাকরির সংকট ও দুর্নীতির অভিযোগে তরুণদের বিক্ষোভ কয়েক দিন ধরে চলছে।

রোববারও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা সরকারি ও রাজনৈতিক ভবন, ব্যাংক ও একটি পুলিশ স্টেশনে হামলা চালায়। পুলিশ জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, গত মঙ্গলবার থেকে সংঘর্ষে ২৭২ জন আহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১৬৯ জন পুলিশ সদস্য।
আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগও দাবি করছেন। রামা পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনের পেছনে ‘বাইরের হাত’ থাকার অভিযোগ করেছেন।

গ্রিসে তাঁবু খাটিয়ে প্রতিবাদ শিক্ষার্থীদের
গ্রিসে আন্দোলনের কেন্দ্র এথেন্সের সিনট্যাগমা স্কয়ার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সেখানে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান নিয়েছেন বাড়িভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি শিক্ষায় পর্যাপ্ত অর্থ না দেওয়ার প্রতিবাদে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আবাসন ব্যয় এত বেড়েছে যে অনেকের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে সরকারি ছাত্রাবাস বাড়ানো ও শিক্ষার্থীদের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা বাড়ানোর দাবি উঠেছে।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ২১ অক্টোবর দেশব্যাপী ধর্মঘট ও বিক্ষোভের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। সেখানে কম বেতন, শিক্ষক সংকট ও অনিরাপদ শ্রেণিকক্ষের মতো বিষয়ও সামনে এসেছে।

আয়ারল্যান্ডেও একই চাপ, তবে শান্তিপূর্ণ পথে
আয়ারল্যান্ডে গত কয়েক সপ্তাহে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের প্রধান বিষয় হয়েছে উচ্চশিক্ষার ব্যয় ও জীবনযাত্রার খরচ। ১ অক্টোবর ডাবলিনে তিন হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ‘ফি কমাও, ভবিষ্যতে বিনিয়োগ করো’ দাবিতে মিছিল করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি, আবাসন, খাবার, জ্বালানি ও অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যয় তাদের প্রধান উদ্বেগ।
সেপ্টেম্বরে ডাবলিনে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে হওয়া আরেক বিক্ষোভে আবাসন ও গরম রাখার খরচের চাপ বিশেষভাবে উঠে আসে। সরকারি কর্মচারীরাও ন্যায্য বেতন-ভাতার দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন।

সংকট আলাদা, ক্ষোভের ভাষা এক
ইউরোপের এই বিক্ষোভগুলোর মধ্যে সরাসরি কোনো একক নেতৃত্ব বা সমন্বিত কাঠামো নেই। ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থা ও জ্বালানি, ইতালিতে জীবনযাত্রার ব্যয় ও জনসেবা, স্পেন ও পর্তুগালে আবাসন, বেলজিয়ামে শিক্ষা ও সরকারি বাজেট, গ্রিসে আবাসন-শিক্ষা এবং আলবেনিয়ায় দুর্নীতি ও শাসনব্যবস্থা— প্রতিটি দেশের ক্ষোভের নিজস্ব কারণ রয়েছে।
তবু সবকিছুকে পাশাপাশি রাখলে একটি বড় চিত্র স্পষ্ট হয়। ইউরোপে এখন সাধারণ মানুষ এমন এক সময়ের মুখোমুখি, যখন জ্বালানি, খাবার, ভাড়া ও শিক্ষা— জীবনের প্রায় প্রতিটি মৌলিক ব্যয়ের চাপ একসঙ্গে বাড়ছে।
বিক্ষোভকারীরা বলছেন, আবাসনের ঘাটতি, স্থবির মজুরি, জনসেবায় দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ঘাটতি ও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মতো ইস্যুগুলো ইউরোপের এসব দেশে বহুদিন থেকেই আলোচনায়। বহুদিন ধরেই তারা এসব সংকট নিরসনের দাবি জানিয়ে আসছেন। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও তেল পরিবহনে বিঘ্ন চলমান চাপকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি সংকটের কারণে জীবনযাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যয়ের বোঝা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে।
তথ্যসূত্র: এএফপি, রয়টার্স, এপি, গার্ডিয়ান, ইন্ডিপেন্ডেন্ট, আল-জাজিরা
source: Rajneete







