বিজ্ঞানী খলিলুরের গবেষণা: যেভাবে পাঙাশ হলো সাশ্রয়ী প্রোটিনের প্রধান উৎস

চাঁদপুর নদীকেন্দ্রে রাত-দিন পার করে দেশে প্রথমবারের মতো থাই পাঙাশের কৃত্রিম প্রজননে সফল হন বিজ্ঞানী মোহাম্মদ খলিলুর রহমান। তার নিরলস গবেষণার হাত ধরেই পাঙাশ সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের সাশ্রয়ী প্রাণিজ আমিষের প্রধান উৎসে পরিণত হয়। জাতীয় দৈনিক ‘আগামীর সময়’-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশে মোট মাছের উৎপাদন ছিল মাত্র ৫ লাখ টন। নদী-নালা হ্রাস ও পানিদূষণের নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও গবেষণার ওপর ভর করে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মাছের উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৫০ দশমিক ১৮ লাখ টনে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিশারিজ টেকনোলজিতে স্নাতকোত্তর শেষ করে ১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) চাঁদপুর নদীকেন্দ্রে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন খলিলুর রহমান। ১৯৮৮ সালে পান দেশি পাঙাশ নিয়ে গবেষণার দায়িত্ব।
চাঁদপুর থেকে বরিশালের হিজলা পর্যন্ত স্পিডবোট বা জাহাজ চালিয়ে নদী থেকে জীবিত পাঙাশ সংগ্রহ করতেন তিনি। তার গবেষণায় ধরা পড়ে, বাংলাদেশের আবহাওয়া পাঙাশ চাষের উপযোগী এবং এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা অপার।
১৯৯০ সালে থাইল্যান্ড থেকে আনা পাঙাশের পোনার কৃত্রিম প্রজননের দায়িত্ব পাওয়ার পর দীর্ঘ তিন বছরের চেষ্টায় ১৯৯৩ সালের ৮ মে তিনি সফল হন। ‘স্ট্রিপিং’ প্রক্রিয়ায় স্ত্রী মাছের ডিম ও পুরুষ মাছের শুক্রাণু মিশিয়ে এই প্রজনন ঘটানো হয়।
উন্মুক্ত হ্যাচারিতে পোনা রক্ষায় খাট পেতে সেখানে রাত কাটাতেন খলিলুর। ১৯৯৫ সালে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজের একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পদ্ধতিটি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হলে একই বছর খলিলুর রহমান রাষ্ট্রীয় পদকে ভূষিত হন।
১৯৯৫-৯৬ সালে বাণিজ্যিক বিস্তার শুরু হয়ে ২০০০ সাল নাগাদ ময়মনসিংহ, বগুড়ার আদমদীঘি, কুমিল্লার লাকসাম, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও যশোরে পাঙাশ চাষ ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বর্তমানে দেশে বছরে ৪ লাখ টনেরও বেশি পাঙাশ উৎপাদিত হচ্ছে।
১৬ বছর ধরে চেষ্টা চালিয়ে ২০০৪ সালের ৩০ জুন দেশি পাঙাশের কৃত্রিম প্রজননে সাফল্য পান এই বিজ্ঞানী। তবে চার মাস যেতে না যেতেই পুকুর থেকে সব পোনা চুরি হয়ে যায়; গঠন করা তদন্ত কমিটিও দোষীদের শনাক্ত করতে পারেনি। পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষের অবহেলায় আর সেই গবেষণার ধারাবাহিকতা রক্ষা হয়নি।
চাকরিজীবনের শেষভাগে ২০১৬ সালে তিনি বিএফআরআইয়ের পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) এবং ২০২০ সালে গবেষণা ও পরিকল্পনা পরিচালক পদে পদোন্নতি পান। জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে মহাপরিচালক পদে নিয়োগ পেলেও দুর্নীতিপরায়ণ নেতৃত্বের কারণে মাত্র ১৫ দিন পদটিতে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে বিএফআরআইয়ের সাবেক পরিচালক আনিছুর রহমান বলেন, তিনি পাঙাশের প্রজনন ঘটিয়ে দেশে এর প্রসারে বড় ভূমিকা রেখেছেন। আমাদের দেশে মহাপরিচালক পদটি রাজনৈতিক। তাকে পদে রাখলে দেশ আরও অনেক কিছু পেত।
বিজ্ঞানীদের এসি রুমে বসে গবেষণা না করে মাঠে ও পুকুরপাড়ে গিয়ে চাষিদের সমস্যা বোঝার তাগিদ দেন খলিলুর রহমান। তিনি নিরাপদ পানি নিশ্চিতকরণ, ওষুধ নিয়ন্ত্রণ, চাষিদের জন্য প্রশিক্ষণ, স্বল্প সুদের ঋণ এবং ব্লক সুপারভাইজারের মতো মৎস্য খাতেও মাঠপর্যায়ের জনবল নিয়োগের পরামর্শ দেন। পাশাপাশি জাটকা সংরক্ষণ আইনে ‘পাঙাশ’ শব্দটি যুক্ত করে নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত ছোট পোনা ধরা বন্ধের প্রস্তাব জানান তিনি।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালে অবসর গ্রহণের পর বর্তমানে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত রয়েছেন খলিলুর রহমান। ‘ফিশ অ্যান্ড ফিশারিজ অব বাংলাদেশ’ বইয়ের এই রচয়িতা তিনি।
source: Asia Post







