ন্যাটো— রাশিয়াকে নিয়ে বড় সতর্কতা ইউরোপীয় গোয়েন্দাদের

ন্যাটোর প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সীমা পরীক্ষা করতে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই রাশিয়া ইউরোপে ‘নির্ণায়ক’ পদক্ষেপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ইউরোপের কয়েকটি দেশের গোয়েন্দা প্রধানেরা। সম্ভাব্য পদক্ষেপের মধ্যে ন্যাটোর ভূখণ্ডে সীমিত অনুপ্রবেশ, ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ‘ফলস-ফ্ল্যাগ’ উসকানি এবং ইউরোপ জুড়ে নাশকতা ও প্রভাব বিস্তারের অভিযান থাকতে পারে বলে তারা মনে করছেন। তবে ন্যাটো ভূখণ্ডে আসন্ন রুশ হামলার কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই বলেও সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা।
চেক প্রজাতন্ত্রের নিরাপত্তা সংস্থা বিআইএসের প্রধান মিখাল কুদেলকা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন, রাশিয়া সীমান্তবর্তী কোনো ন্যাটো দেশে ছোট পরিসরে অনুপ্রবেশ কিংবা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালাতে পারে। তার ভাষায়, এমন পরিস্থিতি ‘বছরের মধ্যে নয়, কয়েক মাসের মধ্যেই’ ঘটতে পারে। তবে ইউরোপীয় দেশগুলো এমন পরিস্থিতি ঠেকাতে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কও সম্প্রতি পার্লামেন্টে একই ধরনের আশঙ্কার কথা জানান। তার ভাষ্য, গোয়েন্দা মূল্যায়নে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, আগামী কয়েক মাসে রাশিয়া ন্যাটোর ভূখণ্ডে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে জোটের ‘আর্টিকেল ৫’ কতটা কার্যকর, তা পরীক্ষা করতে পারে। ন্যাটোর এই ধারায় একটি সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে পুরো জোটের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ টাস্কের সতর্কতাকে ‘যথাযথ ও তথ্যভিত্তিক’ বলে অভিহিত করেছেন। শুক্রবার তিনি ফ্রান্সের রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা ও ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন। বৈঠকে রাশিয়া থেকে বাড়তে থাকা নিরাপত্তা হুমকিও আলোচনায় আসে।
বাল্টিক দেশগুলো সতর্ক
রাশিয়ার প্রতিবেশী বাল্টিক দেশগুলোর গোয়েন্দা কর্মকর্তারা অবশ্য আসন্ন হামলার সম্ভাবনা নিয়ে তুলনামূলকভাবে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। লাটভিয়ার নিরাপত্তা সংস্থা ভিডিডির প্রধান নর্মুন্ডস মেজভিয়েটস বলেছেন, রাশিয়া ন্যাটোতে শিগগির হামলা চালানোর কোনো ইঙ্গিত তারা দেখছেন না। তবে মস্কো ইউরোপে আরও বড় ধরনের পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে— এমন লক্ষণ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
তার মতে, রাশিয়ার এসব প্রস্তুতি সরাসরি সামরিক হামলার জন্য, নাকি ইউরোপীয় সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তা ছড়ানোর বৃহত্তর কৌশলের অংশ— তা এখনো স্পষ্ট নয়। এস্তোনিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাসচিব জোনাতান ভসেভিওভও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলা নিয়ে ‘আতঙ্ক’ না ছড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
ইউরোপের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার সামরিক সম্পদ এখন বড় চাপের মধ্যে থাকলেও ইউরোপে নাশকতা ও গোপন অভিযান বাড়ছে। সুইডেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা মাস্টের প্রধান থমাস নিলসন বলেছেন, ইউক্রেনে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক উদ্যোগ সত্ত্বেও মস্কো সত্যিকার অর্থে আলোচনায় আগ্রহী— এমন লক্ষণ তিনি দেখছেন না।
বরং ইউরোপে রুশ নাশকতার লক্ষ্য ক্রমেই নির্দিষ্ট হচ্ছে বলে জানিয়েছেন লাটভিয়ার মেজভিয়েটস। তার মতে, আগে রেলপথ বা বিভিন্ন স্থাপনায় এলোমেলো নাশকতা ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা দেখা গেলেও এখন ইউক্রেনকে সহায়তা করা অবকাঠামো এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের স্থাপনা লক্ষ্য করা হচ্ছে।
সুইডিশ গোয়েন্দা প্রধান নিলসন জার্মানির লাইপজিগ বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক একটি সশস্ত্র ড্রোন ঘটনার কথা উল্লেখ করে এটিকে ‘গেমচেঞ্জার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে এমন হামলা প্রাণহানি বা বড় ধরনের সামাজিক বিপর্যয় ঘটাতে পারে।
চেক গোয়েন্দা প্রধান কুদেলকার মতে, রাশিয়ার এই নাশকতা ও ‘গ্রে-জোন’ কর্মকাণ্ডের আরেকটি উদ্দেশ্য হলো ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ওপর চাপ বাড়ানো। কোনো অগ্নিকাণ্ড বা যান্ত্রিক ত্রুটির পেছনেও রুশ নাশকতা রয়েছে কি না, তা তদন্ত করতে গিয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সম্পদ ছড়িয়ে পড়ছে।
এদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের তীব্রতাও কমেনি। রোববার ভোরে ইউক্রেন মস্কোসহ রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এর আগে রাশিয়াও ইউক্রেনের শহর ও অবকাঠামোতে নিয়মিত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
ফলে ইউক্রেন যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা চললেও ইউরোপে রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বক্তব্যে আসন্ন রুশ-ন্যাটো যুদ্ধের নিশ্চিত পূর্বাভাসের চেয়ে রাশিয়ার সম্ভাব্য সীমা-পরীক্ষা, নাশকতা ও ইউরোপীয় সমাজে বিভাজন তৈরির কৌশল নিয়েই বেশি উদ্বেগ ফুটে উঠেছে।
source: Rajneete







