News

বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন /সৌদির সঙ্গে লড়াইয়ে সক্ষমতার জানান দিচ্ছে হুতিরা

সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরী লক্ষ্য করে হামলার জন্য ইয়েমেনের হুতি বাহিনীকে দায়ী করছে রিয়াদ। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় সময় গত ১৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় চালানো এ হামলাচেষ্টা নস্যাৎ করে দেওয়া হয়েছে। যদিও পবিত্র মক্কা নগরীকে লক্ষ্যবস্তু করার খবর বরাবরই অস্বীকার করে আসছে হুথি বাহিনী। তবে এর আগে মক্কা আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস রয়েছে।

১৯৭৯ সালের নভেম্বরে প্রায় ৫০০ সশস্ত্র বিদ্রোহী নিয়ে পবিত্র মসজিদুল হারাম (কাবা) দখল করা হয়। বিদ্রোহীদের নেতৃত্বে ছিলেন সৌদি আরবের সাবেক সেনাসদস্য জুহাইমান আল-উতাইবি। পরে সৌদি ও আন্তর্জাতিক বাহিনীর দুই সপ্তাহের অভিযানে তাদের হটিয়ে দিয়ে মসজিদের পুনঃনিয়ন্ত্রণ নেয় সৌদি সরকার। এর আগে ১৯১৬ সালের জুন ও জুলাইয়ে শরিফ হুসেন বিন আলীর নেতৃত্বে আরব বিদ্রোহের সময় উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে মক্কায় যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

হামলা প্রথম না হলেও, আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পবিত্র নগরীতে বিমান হামলার হুমকির সতর্কতামূলক জরুরি সাইরেন বেজেছে। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। সৌদি আরব দাবি করেছে, মক্কার আকাশসীমায় প্রবেশের ‘আগেই’ ড্রোনটি ভূপাতিত করা হয়। আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুসারে, আক্রমণকারী ড্রোনটি ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের পাঠানো বলে দাবি করেছে তারা। ইসলামের অন্যতম স্পর্শকাতর এই অঞ্চলে সাইরেন বেজে ওঠাকে মুসলিম উম্মাহর জন্য বড় সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন বিশিষ্ট আলেমরা।

ঘটনার সূত্রপাত চলতি বছরের জুলাই মাসে। প্রায় এক যুগ ধরে সৌদি আরব নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী ও ইরানের মিলিশিয়া হুতি বাহিনী সংঘাতে লিপ্ত। তবে ইয়েমেনের সানা বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় রিয়াদ-সানার পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর প্রতিক্রিয়ায় হুতি বিদ্রোহীরা ‘চোখের বদলে চোখ’ নীতির ভিত্তিতে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে একটি পাল্টা নৌ-অবরোধ ঘোষণা করে। বিদ্রোহী গোষ্ঠী স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, ইয়েমেনের বন্দরগুলোর ওপর থেকে সৌদি অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত তারা লোহিত সাগরে সৌদি আরবের মালিকানাধীন ও সৌদি বন্দরগামী সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করবে।

এরপর টানা নয় ঘণ্টার রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর হাত থেকে লোহিত সাগরের কৌশলগত উপকূলীয় অঞ্চল ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিয়েছে হুতিরা। এতে পিছু হঠতে বাধ্য হওয়া রিয়াদ আক্রমণ আরও জোরালো করার পরপরই সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে সৌদি আরবের মূল ভূখণ্ডেও। সৌদির গভীরে দফায় দফায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে হুতিরা।

সৌদির অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা ইরানি মিলিশিয়ার

‘দুর্বল’ হুতিদের কাছে শোচনীয় ‘পরাজয়’ মেনে নিতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরব। হাতছাড়া হওয়া অঞ্চল উদ্ধারে মরিয়া হয়ে গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে বিমান হামলা জোরদার করে। চুপ থাকেনি ইরানের আঞ্চলিক প্রক্সি বাহিনীও। তেহরানের থেকে পাওয়া ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও পরামর্শে সৌদি ভূখণ্ডে তাণ্ডব চালায়। রিয়াদের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড খ্যাত ইস্ট-ওয়েস্ট ক্রুড ওয়েল পাইপলাইনে গভীর আঘাত হানে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

অবশ্য, ওই পাইপলাইনে হামলাটি ইরাক থেকে চালানো হয়েছিল বলে দাবি করেছে বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশটি। কিন্তু হামলার দায় স্বীকার করেনি কেউই। তবে রিয়াদের ধারণা, আঞ্চলিক মিলিশিয়া বাহিনী তথা ইরানের প্রক্সি বাহিনীগুলো এই হামলা ঘটিয়ে থাকতে পারে। তাদের সন্দেহের তীর ইয়েমেনের বিদ্রোহী হুতি বাহিনী, ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ) কিংবা বদর অর্গানাইজেশন।

পাইপলাইন অচলাবস্থার কারণে তেল রপ্তানি বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে সৌদি। শুধু কি তাই! লোহিত সাগরে প্রধান রপ্তানি টার্মিনাল ইয়ানবু-তে তেল লোডিংও স্থগিত করেছে সৌদি। এ ছাড়াও ইউরোপীয় শোধনাগারগুলোতে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ স্থগিত বা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে জ্বালানিনির্ভর দেশটি। ইউরোপের অন্তত তিনটি বড় তেল শোধনাগারের চালান ইতোমধ্যেই সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে কিংবা চলতি মাসের শেষ ১০ দিনের পরিবর্তে তা আগামী নভেম্বর পর্যন্ত পিছিয়েছে জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহকারী সংস্থা সৌদি আরামকো।

দৈনিক ৭০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন ক্ষমতাসম্পন্ন ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইনটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় গত ১০ সেপ্টেম্বর। চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম দুই সপ্তাহে মিশরের সিদি কেরির টার্মিনাল থেকে সৌদি তেলের দৈনিক রপ্তানি ছিল প্রায় ১৯ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল। আর আইন সুখনায় পৌঁছানো তেলের পরিমাণ ছিল দিনে প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল। তবে গত ১১ সেপ্টেম্বরের পর থেকে ইয়ানবু বন্দর থেকে নতুন কোনো সৌদি অপরিশোধিত তেলের চালান পাঠানো সম্ভব হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, পাইপলাইনটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে এর প্রভাব শুধু সৌদি আরবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কারণ, পাইপলাইনটি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করছিল, যা বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশের সমান। ফলে দীর্ঘস্থায়ী এই অচলাবস্থা বিশ্ববাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়াতে পারে।

সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক খালিদ বারতাফি বলেছেন, পাইপলাইন বন্ধ থাকার কারণে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল বাজার থেকে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়, তাহলে এটি শুধু সৌদি আরবের সমস্যা থাকবে না, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এরই মধ্যে ইয়ানবুতে তেল লোডিং বন্ধ এবং ইউরোপগামী কিছু চালান বাতিল বা পিছিয়ে দেওয়ার ঘটনায় সেই আশঙ্কারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। ফলে সৌদির সঙ্গে হুতিদের সংঘাত এখন শুধু সীমান্ত বা সামরিক লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং দেশটির গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রপ্তানি অবকাঠামোকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।

এছাড়াও সৌদি আরবের অত্যাধুনিক এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি জানিয়েছে হুতিরা। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) হুতি মুখপাত্র দাবি করেন যে, বিমান হামলা চালানোর উদ্দেশ্যে ইয়েমেনের আকাশে ঢুকে পড়ে সৌদি যুদ্ধবিমান। কিন্তু আনসারুল্লাহ হুতির যোদ্ধারা নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত করেছে। তবে ওই বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি যুদ্ধবিমানটির পাইলটের বিষয়ে কোনো তথ্য জানানো হয়নি। সৌদি আরও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

মক্কায় ড্রোন হামলা

২০১৪ সালে জ্বালানি তেলের ভর্তুকি কমানো ইস্যুতে বড় ধরনের উত্থান ঘটে ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর। সেসময় দেশটির সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে জ্বালানি নিয়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হলে তারা এই জনরোষকে পুঁজি করে আন্দোলন জোরদার করে। রাজধানী সানা দখলে নেয়। পরের বছর থেকে এক অনিশ্চিত রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে সৌদি আরব ও হুতিরা।

গত এক মাসের হামলায় হুতি ও সৌদি-নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনীর হাজার হাজার সেনার হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। দুপক্ষের অন্তত ১ হাজার ৫০০ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। এর মধ্যেই পবিত্র মক্কা নগরীর আকাশসীমায় ‘প্রবেশের আগে’ একটি ‘হুতি ড্রোন’ ভূপাতিত করার দাবিকে কেন্দ্র করে দুই মেরুতে অবস্থান নিয়েছে রিয়াদ ও সানা। দুপক্ষই ড্রোন হামলার ঘটনা নিয়ে একে অপরকে দোষারোপ করছে। ফলে প্রকৃত সত্য নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।

মক্কায় ড্রোন হামলার পর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মক্কার আকাশপথে হুমকির সতর্কতা জারি করে সৌদি আরব। দেশটি সতর্ক করে বলেছে, ইসলামের দুই পবিত্রতম স্থান ও তীর্থযাত্রীদের ওপর হামলা একটি ‘রেড লাইন’। হুতিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে। যদিও ওই ড্রোন হামলার বিষয়ে রিয়াদ মিথ্যাচার করছে জানিয়ে হুতিরা বলেছে, তারা পবিত্র নগরী লক্ষ্যবস্তু করেনি।

সৌদির দাবি প্রত্যাখ্যান করে হুতির মুখপাত্র হাজেম আল-আসাদ এক্সে লিখেছেন, ‘মক্কাকে লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়ে অপরাধী সৌদি শাসকগোষ্ঠীর ছড়ানো মনগড়া কথা ও মিথ্যাচার কাউকেই ধোঁকা দিতে পারে না। তারাই অনৈতিকতা, লাম্পট্য এবং পতিতা আমদানির মাধ্যমে একে কলুষিত করে। পবিত্র স্থানগুলোর প্রতি ইয়েমেনের পক্ষ থেকে বিন্দুমাত্র কোনো হুমকি নেই। আমাদের অভিযানগুলো তাদের তেল স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়, এবং এসব স্থাপনা পবিত্র স্থানগুলো থেকে অনেক দূরে অবস্থিত।’

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটে মক্কার দক্ষিণে নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশের চেষ্টা চালানো একটি শত্রুভাবাপন্ন ড্রোন ধ্বংসের দাবি করে সৌদি আরব। রয়্যাল সৌদি এয়ার ডিফেন্স ফোর্সেসের বরাতে সৌদি জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালকি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘দুই পবিত্র মসজিদ ও তীর্থযাত্রীদের নিরাপত্তা একটি রেড লাইন। সংঘাত নিরসনে জোট যৌথ বাহিনী সন্ত্রাসী হুতি মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করবে না।’

অগ্নিপরীক্ষায় মক্কা জোট

চলতি বছরের আগস্ট মাসে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ‘মক্কা চুক্তি’ বা মক্কা ডিফেন্স অ্যালায়েন্স নামে পরিচিত। এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল সদস্য যে কোনো দেশের ওপর কোনো উসকানিমূলক আক্রমণ হলে সম্মিলিতভাবে তা মোকাবিলা করা। এই লক্ষ্য পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর সঙ্গে মিলে যায়।

কিন্তু সৌদিতে হুতিদের ধারাবাহিক আক্রমণ মক্কা চুক্তির প্রথম অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই হুতিদের এই হামলার মুখে প্রশ্ন উঠেছে যে, জোটভুক্ত রাষ্ট্র আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকা কেন নেই। চলতি মাসের শুরুতে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেন, সৌদি আরবের ওপর বিনা উস্কানিতে হামলা হলে অথবা ইয়েমেনের লড়াই সৌদি রাজ্যে ছড়িয়ে পড়লে মক্কা চুক্তিটি সক্রিয় করা হবে। তার এই মন্তব্যের ফলে প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই জোট এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এর সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও যৌথ প্রতিক্রিয়া জানানোর কৌশলগত কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হতে সময় লাগবে। ফলে সামরিক প্রতিক্রিয়ার চেয়ে বর্তমানে রাজনৈতিক সংহতি ও কূটনৈতিক চাপ তৈরির মাধ্যমেই জোটটি কাজ করছে। এদিকে পাকিস্তান ও তুরস্কের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বার্তাসংস্থা এপি-কে বলেছেন, সৌদি আরব এখনো এই জোটের আওতায় আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক সহায়তা চায়নি। একজন তুর্কি কর্মকর্তা বলেছেন, জোটটি পুরোপুরি কার্যকর করার আগে চুক্তির প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করতে হবে।

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিস ইনস্টিটিউটের (রুসি) ইয়েমেন ও উপসাগরীয় অঞ্চলের গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক বারা শিবান বলেন, ‘হুতিদের মোকাবিলায় সৌদি আরবকে সামরিক পদক্ষেপ নিতেই হতে পারে। সেই পদক্ষেপ সীমিত সময়ের জন্য হতে পারে, আবার দীর্ঘমেয়াদিও হতে পারে। তবে এতে সৌদি আরবের সাম্প্রতিক চুক্তিগুলোও পরীক্ষা হয়ে যাবে। এর মধ্যে মক্কা চুক্তির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির দীর্ঘদিনের মৈত্রীও রয়েছে।’

সাহায্যের আশায় মরিয়া সৌদি, বিপদে পাশে নেই যুক্তরাষ্ট্র

হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক লড়াইয়ে সমর্থন, রসদ, আর্থিক, সৈন্য বা সমরাস্ত্র সহায়তার আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। আরব প্রতিবেশী মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। তাকে নিরাশ করেননি আল-সিসি। সৌদিসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তাকে নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন মিশরের প্রেসিডেন্ট।

যুক্তরাষ্ট্র হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে আপাতত খুব একটা আগ্রহী নয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (মক্কায় ড্রোন হামলা আগে) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দুইবার ফোন করে হুতিদের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের আহ্বান জানান। তবে দুইবারই ট্রাম্প সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। মিত্র ট্রাম্পের কাছে নিরাশ হওয়ার পর ‘আদর্শিক শত্রু’ ইসরায়েলের দ্বারস্থ হন মুসলিম বিশ্বের অন্যতম এই নেতা।

এরই মধ্যে নতুন এক দাবি করে বসেন ট্রাম্প। ডাবলিন সফরের সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, হুতিরাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তারা মার্কিন প্রশাসনকে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। তবে ভিন্ন তথ্য দেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি জানান, হুতিদের পাশাপাশি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ এ অঞ্চলের মিত্রদের সঙ্গেও সরাসরি আলোচনা করছে ওয়াশিংটন।

কেমব্রিজের গার্টন কলেজের প্রেসিডেন্ট ও ইয়েমেন বিশেষজ্ঞ এলিজাবেথ কেন্ডাল বলেন, ‘হুতিদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুব একটা লাভজনক নয়। হুতিরা রাজনৈতিক স্বীকৃতি ও আন্তর্জাতিক মনোযোগ চায়। সরাসরি আলোচনায় বসলে তারা সেটিই পেয়ে যায়। এতে ভবিষ্যতে বহুপক্ষীয় উদ্যোগ নেওয়ার পথও কঠিন হতে পারে।’

তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সহায়তা ছাড়াও হুতিদের মোকাবিলা করার সামরিক সক্ষমতা সৌদি আরবের রয়েছে। দেশটির রয়েছে এ অঞ্চলের অন্যতম শক্তিশালী ও অর্থায়নসমৃদ্ধ বিমানবাহিনী এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। অতীতেও ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দিয়ে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে রিয়াদ। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির আগে কয়েক বছর হুতিদের বিরুদ্ধে জোটের নেতৃত্বও দিয়েছে সৌদি আরব।

ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের বিশ্লেষক সিনজিয়া বিয়াঙ্কো বলেন, মার্কিন সমর্থন ছাড়া সৌদি আরব হুতিদের মোকাবিলা বা পাল্টা জবাব দিতে পারবে না, এমনটা ভাবা ঠিক নয়। মক্কা চুক্তির আওতাভুক্ত মিত্রদের সহায়তা চাওয়া থেকে শুরু করে সৌদি আরব এককভাবেও পদক্ষেপ নিতে পারে। তবে রিয়াদ ইতোমধ্যে বুঝতে পেরেছে, মার্কিন প্রতিরোধব্যবস্থা আগের মতো কার্যকর নয়। তাই সামরিক ও রাজনৈতিক দুই ক্ষেত্রেই হুতিদের মোকাবিলায় নতুন ধরনের কৌশল খুঁজতে পারে সৌদি আরব।

আসলেই মক্কায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে হুতি?

ইসলামের পবিত্র নগরী মক্কায় ড্রোন হামলা কারা করেছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। দীর্ঘদিনের শত্রু হুতিদের সঙ্গে সংঘাতের মুহূর্তে স্বাভাবিকভাবেই গোষ্টীটির ওপর দায় চাপিয়েছে সৌদি আরব। যদিও এই অভিযোগ স্পষ্টত অস্বীকার করেছে হুতিরা। তাদের দাবি, পবিত্র নগরীকে তারা লক্ষ্যবস্তু করেনি। বরং সৌদি সরকারই ‘যৌনকর্মী আমদানি’ করে এই মহান নগরীর পবিত্রতা নষ্ট করে। এ ছাড়াও ড্রোন হামলার পেছনে সৌদির ‘সহানুভূতি বা মনোযোগ আকর্ষণের’র ষড়যন্ত্র থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে ইয়েমেনের বিদ্রোহীরা।

আনাদোলুর খবরে বলা হয়েছে, গত ১৫ সেপ্টেম্বর ড্রোনটি ভূপাতিত করার পরও দায় অস্বীকার করেছে হুতিরা। তবে সৌদি বলেছে, এই হামলা চালিয়েছে হুতিরাই। দুপক্ষের ভিন্ন ভিন্ন দাবির ফলে স্পষ্ট হওয়া যায় না যে, পবিত্র নগরী লক্ষ্যবস্ত করেছে হুতিরা কিংবা সৌদি সরকারের ভাড়াটে বাহিনী। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চর্চিত হচ্ছে যে, হুতি কিংবা সৌদির ভাড়াটে বাহিনীর কেউই নয়, বরং হামলাটি তৃতীয় কোনো পক্ষ থেকে করা হতে পারে।

নেটাগরিকদের যুক্তি, গত মার্চের মাঝামাঝিতে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ ও দেশটির পূর্বাঞ্চলে চালানো ড্রোন হামলার দায় অস্বীকার করেছিল ইরান। একই সঙ্গে তেহরান সেসময় হামলার উৎস তদন্ত করতে সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানায়। তার আগে, সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, রিয়াদ ও পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের আকাশে ১৩টি ড্রোন শনাক্ত করে প্রতিহত এবং ধ্বংস করা হয়েছে।

তবে এসব ড্রোন কোথা থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল বা হামলায় কোনো হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি। হামলার বিষয়েও এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেনি রিয়াদ। তখনকার মতো এবারও হয়তো তৃতীয় কোনো পক্ষ এই হামলা চালিয়ে থাকতে পারে। সৌদি সরকারকে তদন্ত করে হামলার উৎস জানানোর পক্ষেও মত দিয়েছেন কেউ কেউ।

ভূরাজনীতি বিশ্লেষকদের কারও মতে, সৌদি আরব নিশ্চিতভাবেই একটি গল্প তৈরি করেছে। তাদের দাবি, এর উদ্দেশ্য মুসলিম দেশগুলোকে ইরান ও হুতিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে প্রভাবিত করা। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মারান্ডিও এ বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, ইসরায়েলিরা হয়তো সৌদি আরবকে এমন পরামর্শ দিয়ে থাকতে পারে। তবে এ ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি তুলেছেন মার্কিন সামরিক বিশ্লেষক স্কট রিটার। তিনি প্রশ্ন করেছেন, মক্কায় যদি যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব নিজেদের সামরিক সরঞ্জাম মজুত করে বা সেখানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে এবং সেখান থেকে হামলা চালায়, তাহলে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য অন্য দেশগুলো কী করবে?

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ফাওয়াজ গেরগেস প্রশ্ন তুলেছেন, এ ধরনের হামলা চালিয়ে হুতিরা কী অর্জন করতে পারে। সৌদি সরকারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ১৭ লাখের বেশি মুসলমান মক্কায় হজ পালন করেছেন। বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গেরগেস বলেন, ‘ধর্মীয়ভাবে প্রভাবশালী একটি সংগঠন হিসেবে হুতিদের জন্য মক্কাকে লক্ষ্যবস্তু বানানো বিপর্যয়কর হবে। এটা তাদের জন্য উভয় সংকট।’ তবে ঘটনার আরেকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যাও দিয়েছেন গেরগেস। তিনি বলেন, ‘হুতিরা ড্রোন ও হাতে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। তাই এমন একটি বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে যে হুতির ড্রোনটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছিল।’

রিয়াদের অভিযোগের বিষয়ে গেরগেসের মূল্যায়ন হলো, সৌদি আরব বোঝাতে চাইছে যে হুতিরা শুধু তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক যুদ্ধ চালাচ্ছে না, বরং ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র ধর্মীয় স্থানকেও লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা করছে। তার মতে, ‘এই বিষয়টি গভীরভাবে নাড়া দেয়। উভয় পক্ষ এখন শুধু সামরিক সংঘাতেই লিপ্ত নয়, বরং আরব ও মুসলিমদের মন জয়ের লড়াইয়েও লিপ্ত।’

মক্কায় ড্রোন হামলার মানে কী?

১৯১৬ সালের পর কিংবা ১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক মক্কা অবরোধের ঘটনা বাদ দিলে মক্কা অঞ্চলে যে কোনো ধরনের সামরিক তৎপরতা পুরো মুসলিম বিশ্বের মনস্তাত্ত্বিক রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। রিয়াদ একে ‘রেড লাইন’ হিসেবে ঘোষণা করায় হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অল-আউট সামরিক অভিযানের রাজনৈতিক বৈধতা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অনেক বিশ্লেষকের ধারণা।

হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারির দাবি অনুযায়ী সৌদি বিমান বাহিনীর শত শত বিমান হামলার জবাবে হুতিরা যেভাবে খামিস মুশাইত, আভা ও তাইফে সুনির্দিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে, তা প্রমাণ করে ইয়েমেনি বাহিনী এখন দীর্ঘমেয়াদী এবং অপ্রথাগত যুদ্ধের পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন করেছে। কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, হুতি বাহিনীকে ইরানের মিলিশিয়া হিসেবে গণ্য করা হলেও বর্তমানে গোষ্ঠীটি ইয়েমেনে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার দিকেও গভীর মনোনিবেশ করেছে।

ডিসটেন্স ফর টু-এর তথ্য অনুসারে, পবিত্র কাবা শরিফ (মক্কা) থেকে সৌদি আরবের প্রধান তেল স্থাপনা ও তেলক্ষেত্রগুলোর দূরত্ব সাধারণত আকাশপথে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটারের মধ্যে। সড়কপথে এই দূরত্ব প্রায় ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার৪৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। আর ইয়েমেন সীমান্ত থেকে মক্কার আকাশপথের দূরত্ব প্রায় ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ১২৪ কিলোমিটার; অর্থা প্রায় ৬৮০ থেকে ৬৯৮ মাইল।

ওয়াশিংটন-ভিত্তিক থিংক ট্যাংক নিউ আমেরিকার ফেলো অ্যাডাম ব্যারন ইয়েমেন ও উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি সিএনএন-কে বলেন, ‘ড্রোনটির লক্ষ্য মক্কা ছিল কি না, তা নিয়ে হুতি ও সৌদি আরবের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য চলছে। তবে এর মধ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট, সৌদি আরবের অনেক ভেতরে হামলা চালানোর সক্ষমতা হুতিদের রয়েছে। সৌদি আরবের এত গভীরে হামলা চালাতে পারা হুতিদের সামরিক সক্ষমতারই প্রমাণ। তবে এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে তারা কী করতে চায়, সে বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।’

হুতিরা এখন স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে ক্রমেই বেশি আপসহীন ও স্বাধীনভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক লরেঞ্জো কামেল। তিনি বলেন, ‘তাদের যেভাবে প্রায়ই তেহরানের প্রক্সি নেটওয়ার্কের একটি বর্ধিত অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়, আসলে তারা তা নয়। বরং তারা আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব সুদৃঢ় করতে এবং সৌদি আরবকে ছাড় দিতে বাধ্য করার জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।’

কামেল বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক হস্তক্ষেপ ইয়েমেনকে যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে, তা মূলত ‘মাঠপর্যায়ে সৌদি আরবের অপরাধমূলক নীতিমালারই’ ফল। আরও বিস্তৃত প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিচার করলে দেখা যায়… সৌদি কর্তৃপক্ষ সরাসরি যুদ্ধে জড়ায় না। তারা মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে আসবে এবং তাদের হয়ে লড়াই করবে।’

দীর্ঘদিনের এই প্রবণতার উদাহরণ হিসেবে ১৯১৬ সালের আরব বিদ্রোহের কথা উল্লেখ করেন কামেল। তার মতে, ওই সময় ‘হাউস অব সৌদ (সৌদি রাজপরিবার) স্থানীয় অন্যান্য গোষ্ঠীর সঙ্গে সহযোগিতা করার পরিবর্তে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গেই মিত্রতা বজায় রেখেছিল।’ তিনি বলেন, ‘গত কয়েক দশকে সৌদি কর্তৃপক্ষ যেভাবে নিরাপত্তার বিষয়টি অন্যের ওপর ছেড়ে দিয়েছে (আউটসোর্স করেছে), তা উপসাগরীয় অঞ্চল বা বৃহত্তর কোনো এলাকায় কখনোই আনুষ্ঠানিক ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি বয়ে আনবে না।’

এর ফলে বড়জোর ‘অস্ত্রনির্ভর স্থিতিশীলতা বা সামরিকীকৃত স্থিতাবস্থা’ তৈরি হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। কামেলের মতে, এটি প্রকৃত শান্তির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়। তবে ইয়েমেনের এই লড়াই এখন চরম এক মোড়ে অবস্থান করছে। মক্কার ওপর কথিত ড্রোন হামলার এই নতুন মেরুকরণ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে এক নতুন, সংবেদনশীল ও দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেবে কি না, তা নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোতে আঞ্চলিক কূটনৈতিক চালচিত্রের ওপরই।

সংঘাত আরও বাড়বে?

গত মঙ্গলবার মক্কার দিকে চালানো কথিত ড্রোন হামলা ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংবাদমাধ্যম জিও নিউজ-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বুধবার (১৫ সেপ্টেম্বর) পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ পবিত্র নগরী মক্কাকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘটনায় মক্কা চুক্তি কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছেন। হুতিদের বিরুদ্ধে যদি পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তান ও আধুনিক সমরাস্ত্রে বিপ্লব ঘটানো তুরস্ক জড়িয়ে পড়লে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউরোপ ও দক্ষিণ এশিয়ায় সরাসরি যুদ্ধের আঁচ পড়বে।

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রসঙ্গ তুলে চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির গবেষণা ফেলো ফারেয়া আল-মুসলিমী বলেন, বিতর্কিত এই ঘটনার পর রিয়াদকে সমর্থনের ক্ষেত্রে আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা বেড়েছে। তিনি টাইম-কে বলেন, ‘হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সৌদিদের সঙ্গে যুক্ত হলে মক্কাকে রক্ষা করার বিষয়টি তাদের নিজ নিজ দেশে অভ্যন্তরীণ বৈধতা তৈরি করবে।’ তবে গেরগেস মনে করেন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সমর্থন বাস্তবে খুব একটা কার্যকর হবে না। ফলে এমন সমর্থনের সম্ভাবনাও কম। তিনি বলেন, ‘সমস্যা হলো, পাকিস্তান ও তুরস্ক কীভাবে প্রকৃত সহায়তা দেবে, কারণ তাদের সেনাবাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয় নেই। সৌদি আরবের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো স্থলবাহিনী।’

গেরগেস উল্লেখ করেন, হুতিদের ওপর প্রয়োজনীয় ক্ষতি করতে শুধু সৌদি আরবের বিমান হামলা যথেষ্ট নয়। এ পরিস্থিতিতে কূটনীতিই সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প হতে পারে। তিনি বলেন, পুরো সংঘাতজুড়ে হুতিরা ইয়েমেনে উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে নিজেদের অত্যন্ত স্থিতিস্থাপক, গতিশীল, কৌশলী ও দ্রুতগামী হিসেবে প্রমাণ করেছে।

তিনি আরও বলেন, হুতিদের বিরুদ্ধে আবারও সর্বাত্মক যুদ্ধে নামার ক্ষেত্রে কোনো কার্যকর সামরিক বিকল্প আছে কি না, সে বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। অতীতে ওমান ও কাতার এই সংঘাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করেছে। ভবিষ্যতে যে কোনো আলোচনায়ও দেশ দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

source: Asia Post

Back to top button