‘কবি আল মুজাহিদীর জীবনকীর্তি থেকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম প্রাণীত হবে’

বিশিষ্ট কবি, সাহিত্য সাধক ও মুক্তিযোদ্ধা কবি আল মুজাহিদী স্মরণে বাংলা একাডেমি আয়োজিত সেমিনারে বক্তারা বলেছেন, কবি আল মুজাহিদীর কবিতায় এদেশের মাটি ও মানুষের কথা অসাধারণ নৈপুণ্যে ভাস্বর হয়েছে। আল মুজাহিদীকে চেনার একটি উপায় হলো, তার কবিতা। সেখানেই ফুটে আছে তার মনোগোলাপ, যার সুবাস আমরা নিতে পারি। এই ভূখণ্ডের লড়াকু মানুষের স্বতন্ত্র ঐতিহ্যকে তিনি তার কবিতা ও সামগ্রিক সাহিত্যকর্মে ফুটিয়ে তুলেছেন আমৃত্যু। একইসঙ্গে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে তিনি কিংবদন্তিতুল্য। জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের অকুতোভয় যোদ্ধা আল মুজাহিদীর কবিকণ্ঠে শান্তি, মানবতা, সমতা ও মৃত্তিকালগ্ন আধুনিকতার কথা ধ্বনিত হয়েছে সবসময়।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে প্রয়াত বিশিষ্ট কবি আল মুজাহিদী স্মরণে সেমিনারের বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে কবি আল মুজাহিদী স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন বাংলা একাডেমির সচিব ড. মো. সেলিম রেজা। ‘মৃত্তিকার কবি আল মুজাহিদী’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কবি ও প্রাবন্ধিক ড. মাহবুব হাসান।
আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ ও দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার। সভাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম।
ড. মো. সেলিম রেজা বলেন, আল মুজাহিদী বাংলা কবিতার এক অবিস্মরণীয় নাম। তার কবিতায় এ দেশের মাটি ও মানুষের কথা অসাধারণ নৈপুণ্যে ভাস্বর হয়েছে।
ড. মাহবুব হাসান বলেন, আল মুজাহিদীকে চেনার একটি উপায় হলো, তার কবিতা। সেখানেই ফুটে আছে তার মনোগোলাপ, যার সুবাস আমরা নিতে পারি। একটি দীর্ঘ যাত্রায় আমরা লক্ষ্য করেছি আল মুজাহিদী নিজেকে সমর্পণ করেছেন ‘কাঁদো হিরোশিমা, কাঁদো নাগাসাকি’র কবিতাগুলোর মধ্যে। এর সূচনা হয়েছিল ১৯৬৩ সালে। ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বসে লেখা ‘কাঁদো হিরোশিমা, কাঁদো নাগাসাকি’ দিয়ে। তারপর তিনি ১৯৮৮ সাল থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত মানবতাবিরোধী সাম্রাজ্যবাদী ধ্বংসযজ্ঞের নৃশংসতার রূপ তার কলমে শানিয়ে তুলেছেন। তার এই কাব্যযাত্রাই প্রমাণ করে কী বিপুল প্রাণশক্তিতে তিনি মানব-ইতিহাসের হিংস্র নগ্নতার বিরুদ্ধে নিজের কাস্তের মতো ধারালো চিন্তাকে ব্যবহার করেছেন।
মাহবুব হাসান আরও বলেন, অনেকেই আল মুজাহিদীকে চিহ্নিত করেছেন ‘মৃত্তিকার কবি’ হিসেবে। তিনি মৃত্তিকাকেই নানাভাবে, নানা রূপে সৃষ্টি করেছেন তার কবিতায়। যে আদিম মৃত্তিকা দিয়ে এই পৃথিবী গড়া হয়েছিল গৌড় নগরীর সোনালি তোরণ এবং সভ্যতার চিলেকোঠা, তার প্রতি তিনি নিবিড় টান অনুভব করেন। তিনি কখনও কখনও নক্ষত্রের স্তুপে বসবাস করার কথা বললেও চূড়ান্তভাবে বলেছেন মৃত্তিকায় ফিরে আসার কথা।
আলোচকদ্বয় বলেন, আল মুজাহিদী ছিলেন একাধারে কবি, অনুবাদক, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক যোদ্ধা। তার কবিতায় বাংলাদেশ ভাস্বর হয়েছে নিজস্ব নতুন শৈলী ও ভাষাভঙ্গিতে। এই ভূখণ্ডের লড়াকু মানুষের স্বতন্ত্র ঐতিহ্যকে তিনি তার কবিতা ও সামগ্রিক সাহিত্যকর্মে ফুটিয়ে তুলেছেন আমৃত্যু। একইসঙ্গে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে তিনি কিংবদন্তিতুল্য। সুদীর্ঘকাল দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক থাকাকালে তার অনুসন্ধান ও পরিচর্যায় বহু প্রতিভাবান লেখক তাদের সাহিত্যপথের দিশা লাভ করেছেন।
তারা বলেন, জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের অকুতোভয় যোদ্ধা আল মুজাহিদীর কবিকণ্ঠে শান্তি, মানবতা, সমতা ও মৃত্তিকালগ্ন আধুনিকতার কথা ধ্বনিত হয়েছে সবসময়।
অনুষ্ঠানে কবিকন্যা পরমা আল মুজাহিদী বলেন, বাবা সবসময় দেশ ও দেশের মানুষের কথা তার কবিতায় উদ্ভাসিত করেছেন। আল মুজাহিদীর সাহিত্যকর্ম থেকে নতুন প্রজন্ম ভাষা-সাহিত্য ও দেশপ্রেমের প্রেরণা পাবেন নিঃসন্দেহে।
অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, আল মুজাহিদী বাংলাদেশের কবিতাঙ্গনের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। কবিতায় দেশজ আধুনিকতার উদ্ভাসনের পাশাপাশি বিদেশি পুরাণেও খুঁজেছেন মানবিক মৈত্রীর স্বর। কবিতা বিষয়ক গদ্য রচনা, বিভিন্ন ভাষার গুরুত্বপূর্ণ কবিতা বাংলায় অনুবাদ এবং শিশুকিশোর সাহিত্যেও তিনি স্বাতন্ত্র্য ও সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। এ দেশে সাহিত্য সাময়িকী সম্পাদনার ইতিহাসেও কবি আল মুজাহিদীর অবদান কখনও বিস্মৃত হওয়ার নয়।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলা একাডেমির উপপরিচালক সায়েরা হাবীব।
source: Asia Post







