ইরানের হত্যার হুমকিতে খাবারের ট্রাকে লুকিয়ে, ছোট বিমানে তুরস্ক ছাড়েন ট্রাম্প

ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হত্যার হুমকি পাওয়ার পর তুরস্ক থেকে তার গোপন সামরিক ফ্লাইটের আয়োজন করা হয়েছিল। ঘটনাটি ঘটে গত মাসে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে থেকে ফেরার সময়। সে সময় ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উত্তেজনা তীব্র পর্যায়ে ছিল।
গত ৮ জুলাই আঙ্কারায় ট্রাম্প প্রথমে এয়ারফোর্স ওয়ানে ওঠেন। পরে বিমানটি সঙ্গে লাগোয়া একটি খাবার সরবরাহের (ক্যাটারিং) কনটেইনার ট্রাকে চলে যান। পরে ওই ট্রাকে করে তাকে ছোট আকারের সি-৩২এ সামরিক বিমানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেটি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে যুক্তরাজ্যে পৌঁছে দেয়। অথচ হোয়াইট হাউজ তখন জানিয়েছিল, ট্রাম্প পুরনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে করেই তুরস্ক থেকে যুক্তরাজ্যে যাচ্ছেন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ও নিউইয়র্ক টাইমসের পৃথক প্রতিবেদনে এই নিরাপত্তা অভিযানের তথ্য উঠে এসেছে। ওয়াশিংটন পোস্টের খবরে বলা হয়, আঙ্কারায় ট্রাম্পকে পুরনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে উঠতে দেখা যায়। বিমানটি টেলিভিশন ক্যামেরার সামনেই প্রস্তুত ছিল এবং ট্রাম্পও স্বাভাবিক নিয়মে সেটিতে ওঠেন। কিন্তু কয়েক মিনিট পরই গোপনে তাকে অন্য একটি ছোট বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা ওয়াশিংটন পোস্টকে জানান, ট্রাম্পকে ঘিরে ইরানের একটি হুমকি পাওয়ার পরই এই ‘প্রতারণামূলক অভিযান’ শুরু করা হয়। নিউইয়র্ক টাইমসও একজন মার্কিন কর্মকর্তার মাধ্যমে এ অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এর ফলে ট্রাম্পের প্রকৃত অবস্থান সাংবাদিকদের পাশাপাশি হোয়াইট হাউজের কিছু কর্মীর কাছ থেকেও গোপন রাখা হয়েছিল। এমনকি যেসব সাংবাদিক মনে করেছিলেন, তাঁরা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানেই যুক্তরাজ্যে যাচ্ছেন, তাদের বিমানের প্রেস কেবিনের জানালার পর্দা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
পরে সাংবাদিকরা জানতে চান, কেন তাদের জানালার পর্দা বন্ধ রাখতে বলা হয়েছিল। জবাবে ট্রাম্প রসিকতা করে বলেন, তারা ‘সম্ভবত একটি বিপজ্জনক ফ্লাইটে’ ছিলেন। এরপর তিনি বলেন, ‘কিন্তু আমি গেলে তোমরাও যাবে, তাই না?’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পকে বহনকারী আসল বিমানটি ছিল সি-৩২এ। এটি মার্কিন বিমানবাহিনীর ব্যবহৃত ছোট আকারের সামরিক বিমান। আঙ্কারা থেকে যাত্রা শুরু করে স্থানীয় সময় রাত প্রায় ১০টা ২০ মিনিটে এটি যুক্তরাজ্যে পৌঁছায়। পুরনো এয়ার ফোর্স ওয়ান এবং সাংবাদিকদের বহনকারী বিমানটি তার কয়েক মিনিট পর সেখানে পৌঁছায়।
অর্থাৎ বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছিল, ট্রাম্প পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানেই তুরস্ক ছাড়ছেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি তার আগেই গোপনে অন্য একটি বিমানে করে যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে রওনা হয়ে গিয়েছিলেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়, ট্রাম্প যে বিমানে করে আঙ্কারায় পৌঁছেছিলেন, সেখান থেকে তাকে গাড়িতে করে পুরনো এয়ার ফোর্স ওয়ানের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর বিমানের ভিন্ন একটি প্রবেশপথ দিয়ে তাকে ভেতরে তোলা হয়। পরে ওপরের বাম পাশের দরজা দিয়ে এমনভাবে নামানো হয়, যেন তিনি স্বাভাবিক নিয়মেই ওই বিমান থেকে নেমেছেন।
ট্রাম্পের সঙ্গে থাকা সাংবাদিকরা জানান, স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৫৬ মিনিটে ট্রাম্পকে পুরনো এয়ার ফোর্স ওয়ানের সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখা যায়। তবে তিনি তখন সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। এরপর কিছু সময় মার্কিন সেনাসদস্যদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন ট্রাম্প। পরে কাতারের উপহার দেওয়া নতুন বিমানটির দিকে এগিয়ে যান।
নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ান ঘিরেও নিরাপত্তা প্রশ্ন
যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯০ সাল থেকে প্রেসিডেন্টকে বহনকারী উড়োজাহাজ ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’ হিসেবে ব্যবহৃত দুটি পুরনো বোয়িং ৭৪৭–এর অবস্থা নিয়ে ট্রাম্প অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। পরে গত বছর কাতারের রাজপরিবারের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া বিলাসবহুল একটি উড়োজাহাজকে দ্রুত সংস্কার করে তিনি সেটিকে এয়ারফোর্স ওয়ান হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করেন।
গত ১ জুলাই প্রথমবারের মতো এটি ট্রাম্পকে নিয়ে নর্থ ডাকোটায় উড়াল দেয়। এর মাত্র কয়েক দিন পরেই ট্রাম্পের তুরস্ক সফরটি ছিল কাতারের উপহার দেওয়া নতুন বোয়িং ৭৪৭-৮ বিমানে তার প্রথম আন্তর্জাতিক সফর। বিমানটির দ্রুত সংস্কার ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে আগে থেকেই প্রশ্ন উঠেছিল।
আঙ্কারা ছাড়ার আগে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছিলেন, তিনি যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্স মাইল্ডেনহলে যাওয়ার জন্য পুরোনো ‘বেবি ব্লু’ এয়ার ফোর্স ওয়ান ব্যবহার করবেন। তিনি বলেছিলেন, কাতারের দেওয়া নতুন বিমানটিও একই ঘাঁটিতে যাবে, যাতে সেখানে অবস্থানরত মার্কিন সেনাসদস্যরা বিমানটি ঘুরে দেখতে পারেন।
কিন্তু সেই ঘোষণাই পরে ট্রাম্পের প্রকৃত যাত্রাপথ আড়াল করার অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
এ ধরনের নিরাপত্তা কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের জন্য একেবারে নজিরবিহীন নয়। ২০০০ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন পাকিস্তানে গোপনে যাওয়ার সময় একই ধরনের কৌশল নিয়েছিলেন। তার আনুষ্ঠানিক এয়ার ফোর্স ওয়ানকে একটি বিভ্রান্তিমূলক উড়োজাহাজ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। আর ক্লিনটন অন্য একটি বিমানে পাকিস্তানে পৌঁছেছিলেন।
তবে ট্রাম্পের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে। ইরান তুরস্কের প্রতিবেশী এবং ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা চরমে ছিল। ট্রাম্প নিজেও বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বহু শত্রু তার ওপর নজর রাখছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন প্রকাশের পর হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের কাছেও গোপন ফ্লাইটের বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও তাদের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
তবে হোয়াইট হাউজের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভ চিয়াং কাতারের দেওয়া বিমানটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ও তার কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিমানটিতে উচ্চমাত্রার নিরাপত্তাব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। চিয়াং বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট যেমন সম্প্রতি বলেছেন, আমেরিকার অনেক শত্রু তাকে লক্ষ্য করে আছে। এসব হুমকি মোকাবিলায় আমাদের হাতে থাকা প্রতিটি উপায় আমরা ব্যবহার করি।’
source: Rajneete







