News

যুদ্ধ বন্ধে ইউক্রেনের সঙ্গে বৈঠকে রাজি পুতিন, নতুন অগ্রগতির আশা

ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইউক্রেনের সঙ্গে ত্রিপাক্ষিক শান্তি আলোচনা আবার শুরু করতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। আগামী ১০ নভেম্বরের পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে এ আলোচনা শুরু হতে পারে। রাশিয়ার সম্মতির মধ্য দিয়ে কয়েক মাস ধরে স্থবির হয়ে থাকা কূটনৈতিক উদ্যোগে নতুন অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, বুধবার (২১ অক্টোবর) রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টার বৈঠকের পর ক্রেমলিন এ তথ্য জানিয়েছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সঙ্গে ত্রিপাক্ষিক আলোচনায় সমর্থন জানিয়েছেন। বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে প্রথমে লড়াই থামানো এবং পরে নিরাপত্তার নিশ্চয়তাসহ একটি চুক্তিতে পৌঁছানো জরুরি।

ক্রেমলিনের উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ জানান, প্রস্তাবিত আলোচনার মূল লক্ষ্য হবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর রাশিয়া ও ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা। ফেব্রুয়ারির পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় এ ধরনের আলোচনা আর হয়নি। তবে আলোচনায় বসার বিষয়ে সম্মতি মিললেও যুদ্ধের শর্ত নিয়ে দুই দেশের অবস্থানের ব্যবধান এখনো অনেক।

যুদ্ধবিরতি ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চান জেলেনস্কি

উইটকফের সঙ্গে মঙ্গলবার নরওয়ের অসলোতে বৈঠক করেন জেলেনস্কি। সেখানে ফিনল্যান্ড ও নরওয়ের নেতা এবং ইউরোপীয় ও ন্যাটোর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। উইটকফ পুতিনকে জানান, ওই আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা বলেন, ইউক্রেন সেখানে নতুন ধারণা ও প্রস্তাব দিয়েছে।

তবে অসলো বৈঠকের ফল নিয়ে মস্কোর প্রতিক্রিয়া ছিল সতর্ক। উশাকভ বলেন, আলোচনায় উঠে আসা বিষয়গুলোর কিছু দিক রাশিয়াকে পুরোপুরি সন্তুষ্ট করতে পারেনি।

ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি অসলো বৈঠককে ফলপ্রসূ বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ইউক্রেন কূটনৈতিক সমাধানের জন্য প্রস্তুত এবং উইটকফের সঙ্গে পুতিনের বৈঠক থেকেও ইতিবাচক ফল পাওয়ার আশা করছেন।

জেলেনস্কির ভাষায়, ‘লড়াই থামানো, কূটনীতির পথে এগোনো এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তাসহ একটি চুক্তিতে পৌঁছানো গুরুত্বপূর্ণ।’ এ ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির আহ্বানকেও স্বাগত জানান তিনি।

জেলেনস্কি বলেন, ট্রাম্প ও পুতিনের সঙ্গে তার ত্রিপাক্ষিক আলোচনায় বসা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ইউরোপের দেশগুলোও আলোচনায় যুক্ত হলে তা আরও ভালো হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা যেকোনো বিন্যাসে, যেকোনো বিষয়ে আলোচনায় প্রস্তুত। শুধু অনুরোধ— আমাদের নিয়ে আলোচনা করবেন না, আমাদের বাদ দিয়ে নয়।’

যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে অনড় মস্কো

আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হলেও পুতিনের মূল যুদ্ধলক্ষ্যে বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার ইঙ্গিত নেই। মস্কোর প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— পূর্ব ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগ না দেওয়া এবং সাময়িক যুদ্ধবিরতির বদলে সামগ্রিক শান্তিচুক্তি।

এদিকে ট্রাম্প ইউক্রেনকে দ্রুত কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য চাপ বাড়িয়েছেন। মঙ্গলবার তিনি বলেন, যুদ্ধ শেষ করার সময় এসেছে, নয়তো ইউক্রেনের জন্য ‘খুব খারাপ কিছু’ ঘটতে পারে।

বুধবারের বৈঠকে পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধের বাইরেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের প্রস্তাব দেন। ইরান নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ মোকাবিলায় তেহরানের সঙ্গে রাশিয়ার কয়েক দশকের সম্পর্ক কাজে লাগানোর প্রস্তাব দেন তিনি।

ক্রেমলিনের ভাষ্য অনুযায়ী, পুতিন মনে করেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব এবং প্রয়োজনীয়ও। মার্কিন কৃষকদের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ সার সরবরাহের প্রস্তাবও দেন তিনি।

আগামী মাসে চীনে ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠকের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। ক্রেমলিন জানিয়েছে, বেইজিং এরই মধ্যে এ ধরনের প্রথম বৈঠকের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে।

ওয়াশিংটন-কিয়েভ সম্পর্কে টানাপোড়েন

শান্তি আলোচনার উদ্যোগের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের সম্পর্কেও সাম্প্রতিক সময়ে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম কমানোর লক্ষ্যে রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল রপ্তানি চুক্তির ঘোষণা দেন ট্রাম্প। ইরানে মার্কিন হামলার পর জ্বালানির উচ্চমূল্য নিয়ে চাপের মুখে রয়েছে তার দল রিপাবলিকান পার্টি, নভেম্বরের আইনসভা নির্বাচন সামনে রেখে যা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

চুক্তির পর গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং ইউক্রেনের সামরিক যোগাযোগে ব্যবহৃত স্যাটেলাইট সেবা নিয়ে সমস্যার কথা জানিয়েছিল কিয়েভ। তবে জেলেনস্কি বলেছেন, অসলো বৈঠকে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান পুনরায় চালুর বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। স্যাটেলাইট সেবার সীমাবদ্ধতাও শিগগির দূর হবে বলে আশা করছেন তিনি।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বুধবারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্ক গত সপ্তাহে ইউক্রেনের ব্যবহৃত স্টারলিংক স্যাটেলাইট সেবার সামরিক সংস্করণ স্টারশিল্ডের কার্যক্রম ধীর করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ইউক্রেন রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা শনাক্ত করতে এ প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে। রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবেদনটি যাচাই করতে পারেনি।

মাস্ক বলেছেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বা প্রেসিডেন্ট নিয়ে থাকেন। ট্রাম্পও বলেছেন, এ সিদ্ধান্তের জন্য তিনি দায়ী নন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বুধবার বলেন, স্টারলিংক ব্যবহারে ইউক্রেনের সক্ষমতা কমানোর সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটন নেয়নি। বরং স্পেসএক্স ও মাস্ক নিজে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন।

জেলেনস্কি জানান, স্টারশিল্ড নিয়ে সমস্যা সমাধানে রুবিওর সঙ্গে তার কথা হয়েছে। তবে সেবাটির ওপর বিধিনিষেধ এখনো পুরোপুরি তুলে নেওয়া হয়নি।

বুধবারের বৈঠকে পুতিনের সঙ্গে উইটকফের আলোচনায় সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির বিভিন্ন ধারণা-সংবলিত নথি উপস্থাপন করা হয়। ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারও পুতিনের কাছে কিছু প্রস্তাব তুলে ধরতে চেয়েছিলেন এবং পরে ফোনে বৈঠকে যুক্ত হন। রাশিয়ার বিশেষ বিনিয়োগ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভও আলোচনায় ছিলেন। ক্রেমলিন জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের যৌথ অর্থনৈতিক প্রকল্প নিয়েও কথা হয়েছে, এর মধ্যে কয়েকটি বাস্তবায়নের কাছাকাছি।

বৈঠকের আগে সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে রাশিয়া অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন স্কুলশিক্ষক স্টিফেন হাবার্ডকে মুক্তি দেয়। তাকে মুক্তি দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন ট্রাম্প।

যুদ্ধের অবসানে ত্রিপাক্ষিক আলোচনা ফের শুরুর সম্ভাবনা তৈরি হলেও সমঝোতার পথ এখনো অনিশ্চিত। আলোচনার অগ্রগতি নির্ভর করবে যুদ্ধবিরতি, ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা নিয়ে মস্কো ও কিয়েভ কতটা কাছাকাছি আসতে পারে তার ওপর।

source: Rajneete

Back to top button