News

হরমুজ প্রণালির তলদেশে ইন্টারনেট ক্যাবলে হামলার হুমকি ইরানের

মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংঘাত এবার ছড়িয়ে পড়তে পারে বৈশ্বিক তথ্যপ্রযুক্তির স্নায়ুকেন্দ্রে। হরমুজ প্রণালির তলদেশ দিয়ে যাওয়া সমুদ্রগর্ভের ইন্টারনেট ক্যাবলে হামলার সরাসরি হুমকি দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুষ্ঠানারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)।

কেবল জ্বালানি পরিবহনই নয়, আন্তর্জাতিক ডিজিটাল যোগাযোগ ও বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অতিগুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের সাবমেরিন ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট ও বাণিজ্যিক তথ্য আদান-প্রদান চরম বিপর্যয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সোমবার তেহরানের সেক্রেড ডিফেন্স মিউজিয়ামে এক অনুষ্ঠানে আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি এ হুমকি দেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবির (আইআরআইবি) বরাত দিয়ে এ তথ্য জানা গেছে।

মোহেব্বি বলেন, “হরমুজ প্রণালির তলদেশ দিয়ে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও যোগাযোগ ক্যাবল গেছে।” তার দাবি, ইন্টারনেট ও বাণিজ্যিক তথ্যপ্রবাহের পুরোটাই এসব ক্যাবলের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়।

আরো পড়ুন

আইআরজিসির মুখপাত্র আরও বলেন, “আমরা শুধু তাদের জানাতে চাই, নতুন নতুন লক্ষ্যবস্তু সামনে আনা হবে। নতুন অস্ত্রও উন্মোচন করা হবে।”

এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রভাব এখনো এ অঞ্চলে রয়ে গেছে, তার অবশিষ্টাংশও তাড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করেন আইআরজিসির এই মুখপাত্র।

ইরানের এই হুমকির আগে মার্চের শুরুতে ড্রোন হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের (এডব্লিউএস) অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ওই হামলায় স্থাপনার ভৌত ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে এবং ক্লাউডভিত্তিক বিভিন্ন সেবা বন্ধ হয়ে যায়।

এদিকে টেলিযোগাযোগ খাতের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান টেলিজিওগ্রাফির তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে তথ্য পরিবহনের সক্ষমতার ৯০ শতাংশের বেশি নির্ভর করে লোহিত সাগরের তলদেশ দিয়ে যাওয়া ফাইবার-অপটিক ক্যাবলের ওপর।

লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ বাব আল-মানদেব প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় এলাকা ও নৌপথ নিয়ন্ত্রণ করে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। ফলে এই অঞ্চলেও তেহরানের চাপ সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মানদেব- দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ ঘিরে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়লে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট যোগাযোগ, বাণিজ্যিক তথ্য আদান-প্রদান এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্নের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

চলতি মাসের শুরুতে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাইও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে সমুদ্রতলের ইন্টারনেট ক্যাবল, ডেটা সেন্টার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়েছিলেন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম প্রেস টিভিকে তিনি বলেছিলেন, এসব অবকাঠামো এখনও তাদের লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তবে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে সেগুলো ধ্বংস করা হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

উপসাগরীয় দেশগুলো যখন ডেটা সেন্টার ও এআই অবকাঠামো গড়ে তুলতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে, তখন ইরানের এই হুমকি ওই অঞ্চলের প্রযুক্তি খাতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রতলের যোগাযোগ ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেগুলো মেরামত করা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল হতে পারে। বিশেষায়িত মেরামতকারী জাহাজের প্রয়োজন হয় এসব ক্যাবল মেরামতে। কিন্তু সামরিক তৎপরতা চলমান থাকলে নিরাপত্তাঝুঁকি এবং চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে মেরামতকাজ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। এর জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় এবং কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। পরে ওয়াশিংটন ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করে।

জুনে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের নিরাপত্তা নিয়ে মতবিরোধের কারণে সমঝোতাটি বাস্তবায়নের অগ্রগতি থমকে যায়।

এমন পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালির তলদেশে থাকা যোগাযোগ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিতে পারে। কারণ, এই অঞ্চলের সামুদ্রিক পথগুলো শুধু জ্বালানি পরিবহনের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক ডিজিটাল যোগাযোগ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সৌদি গেজেট অবলম্বনে

source: Rajneete

Back to top button