News

ফের ইরানে মার্কিন হামলা, হরমুজ ঘিরে বাড়ছে যুদ্ধের ঝুঁকি

এক মাস বিরতির পর ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত আবারও সরাসরি সামরিক লড়াইয়ের দিকে মোড় নিয়েছে। দুই দিন আগে ইরানের লারাক দ্বীপে হামলার পর এবার ইরানের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে নতুন দফায় বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও ব্রিটিশ গণমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার পর ইরানের কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাস ও চাবাহারে একাধিক বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) জানায়, স্থানীয় সময় দুপুর ১২টায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শুরু করে মার্কিন বাহিনী। তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ এবং মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে ইরানের সাম্প্রতিক হামলার জবাব হিসেবেই এই অভিযান চালানো হয়েছে।

সেন্টকমের ভাষ্য, আইআরজিসি সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার চেষ্টা করেছে এবং ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন সেনাদেরও লক্ষ্য করেছে। এসব পদক্ষেপের পরই নতুন হামলার সিদ্ধান্ত নেয় ওয়াশিংটন।

ইরানি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, হরমুজের উত্তর পাশে কেশম দ্বীপে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা নূর নিউজ বন্দর আব্বাস ও দক্ষিণ উপকূলের চাবাহারেও বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে। তবে হামলায় ঠিক কোন কোন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিংবা হতাহতের সংখ্যা কত, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি।

লারাক থেকে নতুন হামলার শুরু

মঙ্গলবারের হামলার পেছনে রয়েছে গত রোববারের ঘটনা। এক মাসের বেশি সময়ের বিরতির পর ওই দিন ইরানের লারাক দ্বীপে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছিল, ইরানের আইআরজিসি হরমুজ প্রণালিতে সমুদ্র মাইন ছোড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সেই ‘আসন্ন হুমকি’ ঠেকাতেই লারাকে থাকা রকেট লঞ্চার লক্ষ্য করে সীমিত ও নির্ভুল হামলা চালানো হয়।

মার্কিন সেন্টকমের দাবি ছিল, ইরানের মাইন পাতা ঠেকাতে এবং বেসামরিক নাবিক, বাণিজ্যিক জাহাজ ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের অবাধ চলাচল রক্ষায় ওই অভিযান চালানো হয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

ইরানের সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, লারাক হামলায় তিনজন নিহত হন। তাদের মধ্যে দুজন আইআরজিসির নৌ বাহিনীর সদস্য ছিলেন বলে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এর জবাবে ইরান জর্ডানে থাকা দুটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। জর্ডান ও যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রতিহত করা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতও জানিয়েছে, তাদের জলসীমার ওপর একটি ইরানি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে।

সেই পালটা হামলার পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে আঘাতের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। সোমবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, পরিস্থিতি অনুযায়ী আরও কঠোর হামলা প্রয়োজন হতে পারে।

এক দিনের মধ্যেই সেই হুমকি বাস্তবে রূপ নিল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন এসব হামলার মধ্য দিয়ে ইরান যুদ্ধ নতুন করে বড় সংঘাতের দিকে রূপ নিতে পারে।

গত সপ্তাহের শেষের দিকের পালটাপালটি হামলার পরও দুপক্ষের বক্তব্যে সংঘাতকে সীমিত রাখার ইঙ্গিত ছিল। ট্রাম্পও বলেছিলেন, এই হামলা সরাসরি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফেরার অর্থ নয়। ইরানের একটি জ্যেষ্ঠ সূত্রও সংঘাতটিকে ‘সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত’ হিসেবে বর্ণনা করেছিল। কিন্তু মঙ্গলবারের নতুন মার্কিন হামলা সেই হিসাবকে জটিল করে দিয়েছে।

কারণ এখন ঘটনাপ্রবাহটি দাঁড়িয়েছে— প্রথমে লারাকে মার্কিন হামলা, এরপর জর্ডানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং তার জবাবে আবার ইরানের ভেতরে মার্কিন হামলা। এর ফলে তেহরানের পালটা জবাবের আশঙ্কাও বাড়ছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মঙ্গলবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি জুনের সমঝোতা স্মারকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিতে ফিরে আসে, তাহলে ইরানও সঙ্গে সঙ্গে তার অবস্থান পুনর্বিবেচনা করবে। তবে একই সঙ্গে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, পারস্য উপসাগর থেকে ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করার চেষ্টা হলে কাউকেই ওই অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি করতে দেওয়া হবে না।

অর্থাৎ সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি এখন হরমুজকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক যুদ্ধও আরও তীব্র হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

হরমুজে আক্রান্ত ২ তেলবাহী জাহাজ

নতুন মার্কিন হামলার আগে থেকেই হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল। সোমবার কয়েক মিনিটের ব্যবধানে সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল বহনকারী দুটি সুপারট্যাংকার অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাহাজ দুটি হলো সৌদি পতাকাবাহী ‘সিদর’ ও লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ‘সেনেগাল প্রসপারিটি’। দুটিই সৌদি আরবের জুয়াইমাহ টার্মিনাল থেকে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল করে অপরিশোধিত তেল নিয়ে হরমুজ দিয়ে বের হচ্ছিল।

শিপিং ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠান মারিস্কস জানিয়েছে, ‘সিদর’ ওমানের খাসাবের উত্তর-পূর্বে প্রায় ১৬ দশমিক ৬ নটিক্যাল মাইল দূরে প্রজেক্টাইলের আঘাতে আক্রান্ত হয়। কয়েক মিনিট পর ‘সেনেগাল প্রসপারিটি’তেও তিনটি প্রজেক্টাইল আঘাত হানে। জাহাজ দুটির সব নাবিক নিরাপদ আছেন বলে জানা গেছে।

ব্রিটিশ মেরিটাইম কর্তৃপক্ষও হরমুজ থেকে বের হওয়ার সময় একটি ট্যাংকারে তিনটি প্রজেক্টাইল আঘাত হানার খবর পেয়েছে। এসব হামলার দায় এখন পর্যন্ত কেউ স্বীকার করেনি।

ঘটনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের বড় একটি অংশ পরিবাহিত হয়। গত ছয় মাসের সংঘাত ও অবরোধে সেই সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কাতার ও ওমানের মধ্যস্থতায় প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়ার উদ্যোগও এখন পর্যন্ত সফল হয়নি।

‘দুই বছরে মূল্যহীন হয়ে যাবে হরমুজ’

সামরিক হামলার পাশাপাশি ওয়াশিংটন অর্থনৈতিক চাপও বাড়াচ্ছে। মঙ্গলবার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরানের আরও কয়েকটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা খুব শিগগিরই ঘোষণা করা হতে পারে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহেই একটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে এবং পরের সপ্তাহে আরও একটি ব্যাংককে লক্ষ্য করা হতে পারে।

হরমুজ নিয়েও বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন বেসেন্ট। তার দাবি, বিকল্প তেল পাইপলাইন ও স্থলপথ ব্যবহারের কারণে আগামী দুই বছরের মধ্যে হরমুজ প্রণালি কার্যত ‘মূল্যহীন এক টুকরো পানিতে’ পরিণত হতে পারে।

বেসেন্ট তার বক্তব্যে হরমুজের ওপর ইরানের কৌশলগত প্রভাব কমাতে ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত করেন। তবে বাস্তবতা বলছে, অদূর ভবিষ্যতে হরমুজের গুরুত্ব এত সহজে শেষ হয়ে যাওয়ার নয়। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটি দীর্ঘ সময় অস্থিতিশীল থাকলে তেল সরবরাহ, জাহাজ চলাচল এবং বিশ্ববাজারে এর প্রভাব পড়তেই থাকবে।

তেলের বাজারেও চাপ

হরমুজে নতুন করে জাহাজে হামলা এবং ইরানে মার্কিন হামলার খবর এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে প্রভাব ফেলেছে। মঙ্গলবার তেলের দাম আরও বেড়েছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ, এখন বাণিজ্যিক জাহাজও সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। একটি মার্কিন-ইরান সংঘাত যদি হরমুজের নিরাপত্তাকে আরও দুর্বল করে দেয়, তাহলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, এশিয়া ও ইউরোপের জ্বালানি বাজারেও তার ধাক্কা লাগবে।

মঙ্গলবারের হামলার পর এখন মূল প্রশ্ন— ইরান কীভাবে জবাব দেয়। তেহরান এরই মধ্যে জানিয়েছে, সামরিক ও কূটনৈতিক— দুই পথেই তারা নিজেদের সক্ষমতা ব্যবহার করবে। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান আবার আলোচনার দরজাও পুরোপুরি বন্ধ করেননি। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে নতুন হামলা চালাচ্ছে, অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ফলে সংঘাত এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে একটি ভুল হিসাব বা বড় ধরনের প্রাণহানি পরিস্থিতিকে দ্রুত পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ঠেলে দিতে পারে।

source: Rajneete

Back to top button