যুক্তরাষ্ট্রের লাফায়েত স্কয়ারে স্থায়ী বেড়ার পরিকল্পনা, সীমিত হবে প্রতিবাদের সুযোগ

যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে হোয়াইট হাউজের সামনের ঐতিহাসিক লাফায়েত স্কয়ারে স্থায়ী বেড়া ও ফটক বসানোর পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা জোরদারের এ উদ্যোগে নাগরিকদের প্রবেশাধিকার ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সুযোগ সীমিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন নাগরিক অধিকারকর্মীরা। অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি, সহিংসতা ও ভাঙচুর ঠেকাতে স্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজন।
লাফায়েত স্কয়ার দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও নাগরিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ স্থান। হোয়াইট হাউজের কাছে হওয়ায় এখান থেকে বিক্ষোভকারীরা সরাসরি প্রেসিডেন্ট ও তার প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন। দেশটির সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে বাক্স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ এবং সরকারের কাছে দাবি জানানোর অধিকার সুরক্ষিত রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পার্কটি এসব অধিকার চর্চার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
-77859d.jpg)
বিশ শতকের শুরুর দিকে নারীদের ভোটাধিকারের দাবিতে আন্দোলনকারীরা হোয়াইট হাউজের সামনে নিয়মিত অবস্থান নিতেন। ১৯১৭ সালে ন্যাশনাল উইমেনস পার্টির কর্মীরা বৃষ্টি ও তুষারপাত উপেক্ষা করে ব্যানার হাতে সেখানে দাঁড়ান। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন যেন নারীদের ভোটাধিকারের পক্ষে অবস্থান নেন, সেটিই ছিল তাদের দাবি।
পরবর্তী দশকগুলোতেও বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে লাফায়েত স্কয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ১৯৬৩ সালে আলাবামার বার্মিংহামে একটি গির্জায় বোমা হামলায় নিহত চার কৃষ্ণাঙ্গ শিশুর স্মরণে সেখানে সমাবেশ করেন নাগরিক অধিকার আন্দোলনের কর্মীরা।
১৯৭৪ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের অভিশংসনের দাবিতে বিক্ষোভকারীরা হোয়াইট হাউজের সামনে জড়ো হন। ১৯৯১ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের যুদ্ধনীতির বিরোধিতা এবং ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসননীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভেও পার্কটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
-a9fd08.jpg)
সময়ের সঙ্গে প্রতিবাদের বিষয়বস্তু বদলালেও ক্ষমতার কেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে সরকারের নীতির বিরোধিতা বা সমর্থন জানানোর সুযোগটি একই রয়েছে। স্থায়ী বেড়া বসানোর পরিকল্পনা ঘিরে বিতর্কের অন্যতম কারণও এটি।
নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ, আপত্তি নাগরিক অধিকার নিয়ে
লাফায়েত স্কয়ারে নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ নতুন নয়। ২০২০ সালে বর্ণবাদবিরোধী বিক্ষোভের সময় পার্কটির আশপাশের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। এরপরও হোয়াইট হাউজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য, বিক্ষোভের সময় সহিংসতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা এবং সম্পত্তি ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঠেকাতে স্থায়ী ব্যবস্থা প্রয়োজন।
চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রশাসনের পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কমিশন অব ফাইন আর্টসের আলোচনায় বিষয়টি ওঠে। পরে ৩ সেপ্টেম্বর ন্যাশনাল ক্যাপিটাল প্ল্যানিং কমিশনের বৈঠকে স্থায়ী বেড়া ও ফটক বসানোর প্রস্তাব নিয়ে আপত্তি জানান নাগরিক অধিকারকর্মী, ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণে কাজ করা সংগঠন এবং ওয়াশিংটনের বাসিন্দারা। কমিটি প্রস্তাবটির বিভিন্ন সংস্করণ গ্রহণ করলেও নকশা ও বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকে।
ওয়াশিংটন ডিসির প্রতিনিধি এলিনর হোমস নর্টন স্থায়ী বেড়া নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে কংগ্রেসে একটি বিলও উত্থাপন করেছেন। তার যুক্তি, লাফায়েত স্কয়ারের উন্মুক্ত পরিবেশ যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের অংশ। জনগণের প্রবেশাধিকার সীমিত করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা গণতন্ত্র ও নাগরিকদের মধ্যে দূরত্ব বাড়াতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
সমালোচকদের আরেকটি আশঙ্কা, স্থায়ী বেড়া বসানোর পর ফটক বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত প্রশাসনের হাতে পার্কটির ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ তুলে দিতে পারে। এতে হোয়াইট হাউসের সামনে সরাসরি বিক্ষোভ আয়োজন কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বক্তব্য, অস্থায়ী ব্যারিকেডের তুলনায় স্থায়ী ব্যবস্থা বেশি কার্যকর। নিরাপত্তার প্রয়োজনে পার্কের প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি হতে পারে।
নিরাপত্তা ও প্রতিবাদের অধিকারের প্রশ্ন
লাফায়েত স্কয়ার নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের প্রতিবাদের অধিকার অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টি। হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। একই সঙ্গে সরকারের নীতির বিরোধিতা জানাতে নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত জনপরিসর বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে স্থায়ী বেড়া বসানোর পরিকল্পনাটি কেবল ওয়াশিংটনের একটি ঐতিহাসিক পার্কের নকশা পরিবর্তনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনসাধারণের প্রবেশাধিকার, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা এবং ক্ষমতাসীনদের সামনে সরাসরি মতপ্রকাশের সুযোগ কতটা অবারিত থাকবে, সেই প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিস, এপি এবং ওয়াশিংটন পোস্ট
source: Rajneete







