গ্যাস সংকটে গতি বাড়েনি বরিশাল বিসিকের

পদ্মা সেতু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থায় এসেছে বড় পরিবর্তন। কিন্তু গ্যাস সংকটে গতি বাড়েনি শিল্পনগরী বরিশাল বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক)। ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শিল্পনগরীর ৫৩০টি প্লটের মধ্যে ১১২টি পড়ে আছে বরাদ্দহীন। এসব প্লট বরাদ্দ দিতে গত ১৫ আগস্ট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল বিসিক। নির্ধারিত সময়ে মাত্র ২২টি প্রতিষ্ঠান ফরম সংগ্রহ করায় আবেদনের সময়সীমা ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রধান বাধা গ্যাস-সংকট। তিনটি গার্মেন্টস কারখানার জন্য প্লট বরাদ্দ দেওয়া হলেও গ্যাসের অভাবে সেগুলো গড়ে ওঠেনি। বিদ্যুৎ সরবরাহেও সমস্যা রয়েছে।
বরিশাল বিসিকের কর্মকর্তা গোলাম রসুল এশিয়া পোস্টকে বলেন, শিল্পনগরীতে বর্তমানে বড় ধরনের প্রতিষ্ঠান নেই। এর মূলে গ্যাস-সংকট একটি বড় সমস্যা। গ্যাস না থাকায় বড় ও মাঝারি কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। তিনটি গার্মেন্ট কারখানা স্থাপনের জন্য প্লট বরাদ্দ নেওয়া হলেও গ্যাসের অভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে ওঠেনি।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহও আরেকটি একটি সমস্যা। সমাধানে একটি উপকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। শিল্পনগরীর জন্য ডেডিকেটেড ফিডার চালুর আশ্বাস দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, সিলিন্ডার গ্যাস ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করে উৎপাদন করতে গিয়ে খরচ বেড়ে যাচ্ছে। ফলে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ কমছে। গ্যাস সরবরাহ না থাকায় বড় ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বড় বাধা তৈরি হয়েছে।
বিসিক শিল্পনগরীর অন্যতম প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল বিস্কুট লিমিটেডের মাসিক উৎপাদন সাত কোটি টাকার পণ্য হলেও গ্যাসের অভাবে ব্যয় গুনতে হচ্ছে প্রায় ৭০ লাখ টাকা, যা প্রাকৃতিক গ্যাসে হলে মাত্র ১০-১৫ লাখ টাকা হতো বলছেন প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র ম্যানেজার (কারখানা) মো. আবদুর রহমান বলেন, পণ্য উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় প্রতিযোগিতায় এগোতে পারছেন না শিল্পোদ্যোক্তারা। বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে রয়েছে নানা জটিলতা। গ্যাস না থাকায় বিসিক এলাকায় উৎপাদন ব্যয় যেমন বেড়েছে, তেমনি নতুন বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান না হলে নতুন বিনিয়োগকারীরা এসে কতটা সুবিধা করতে পারবে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
বিসিক সূত্রে জানা যায়, ১৩১ দশমিক ৬১ একর জমির উপর ১৯৬০ সালে শিল্পনগরীটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে মোট প্লট ৫৩০টি। এর মধ্যে পুরোনো অংশে ৩৯৭টি এবং নতুন অংশে ১৩৩টি উন্নত প্লট রয়েছে। ১৭৭টি শিল্প ইউনিটের অনুকূলে ৪১৮টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আরও ১১২টি প্লট এখনও বরাদ্দের অপেক্ষায় রয়েছে। বর্তমানে শিল্পনগরীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আট হাজার ৩২০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। তাদের মধ্যে চার হাজার ৫৭৮ জন নারী এবং তিন হাজার ৭৪২ জন পুরুষ।
বরাদ্দ পাওয়া প্লটগুলোর মধ্যে খাদ্য ও খাদ্যজাত পণ্যের ৫৪টি, বস্ত্র ও বস্ত্রজাত পণ্যের ১৯টি, প্রকৌশল ২২টি, ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স ছয়টি, কেমিক্যাল ৩৬টি, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের ছয়টি, প্রিন্টিং ও প্যাকেজিং ১২টি, বন ও বনজ ১১টি এবং বিবিধ ১৩টি শিল্প ইউনিট উৎপাদনে রয়েছে। বিসিকের হিসাবে বর্তমানে শিল্পনগরীতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৮৯৭ কোটি ৪২ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
বরিশাল বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা গোলাম রসুল বলেন, প্লট বরাদ্দ নেওয়ার বিষয়ে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ রয়েছে। কেমিষ্ট, রেফকো এবং একটি ফুটওয়্যার কোম্পানিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্লট নিতে আগ্রহ দেখিয়েছে।
তিনি জানান, বরাদ্দ না হওয়া ১১২টি প্লটের জমির মূল্য প্রতি শতাংশ চার লাখ ৮০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ভূমি উন্নয়ন কর প্রতি শতাংশে দেড় টাকা এবং সার্ভিস চার্জ আড়াই টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
গোলাম রসুলের মতে, গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল নয় এমন শিল্পের জন্য বরিশাল বিসিকে সুযোগ রয়েছে। ফার্মাসিউটিক্যাল, প্যাকেজিং ও প্রিন্টিং, ফুড প্রসেসিং, প্রকৌশল এবং নিটওয়্যার খাতে বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। এসব শিল্পে প্রয়োজনীয় জনবলও সহজে পাওয়া যাবে।
শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, পদ্মা সেতু নির্মাণের পর দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এলেও পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় বরিশালে কলকারখানা তৈরির সাহস পাচ্ছেন না তারা। পরিস্থিতি উত্তরণে ভোলার গ্যাস পাইপলাইনে সরবরাহের দাবি শিল্পোদ্যোক্তাদের।
বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক হাফিজুর রহমান হিরা বলেন, বরিশালে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন এলাকায় আমূল পরিবর্তন আনতে হলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করতে হবে। পদ্মা সেতুসহ সব মিলিয়ে এখানে শিল্প বিপ্লবের যে সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে তার পুরোপুরি সুফল নিতে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহের কোনো বিকল্প নেই। দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে বরিশালের স্থানীয় অর্থনীতি সেভাবে যাচ্ছে না। শিল্প-কারখানা গড়ায় রয়েছে নানা প্রতিকূলতা। যেগুলোও আছে তা অন্য বিভাগের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাচ্ছে। ফলে দ্রুত ভোলার গ্যাস বরিশালে আনার দাবি জানাই।
তিনি আরও বলেন, পদ্মা সেতু যোগাযোগে আমূল পরিবর্তন আনলেও প্রাকৃতিক গ্যাস না থাকায় এগোচ্ছে না শিল্প-কারখানা। সিলিন্ডার গ্যাস আর বিদ্যুৎ দিয়ে পণ্য উৎপাদনে খরচ বেশি হওয়ায় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাচ্ছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। বরিশাল বিভাগের ভোলায় আছে প্রাকৃতিক গ্যাস। যদি ভোলার গ্যাস বরিশালে আসে তবে পুরো চিত্র পাল্টে যাবে। পাশাপাশি বিসিক এলাকায় কাঙ্খিত কারখানা গড়ে উঠবে। সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থান।
source: Asia Post







