সাক্ষাৎকার

আমি সর্বজনীন গণতন্ত্রের কথা বলেছি

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের সাবেক এই শিক্ষকের সামগ্রিক চিন্তার মূলে রয়েছে বাংলাদেশকে একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র হিসেবে দেখা। বাংলার অধ্যাপক হয়েও তাঁর বড় পরিচয় একজন রাষ্ট্রচিন্তক। তাঁর মুখোমুখি হয়েছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক।

আপনি তো কিশোরগঞ্জের সন্তান?

আমার জন্ম ৩১ জুলাই ১৯৪৪, কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়ায়।

আপনার বাবাও তো শিক্ষক ছিলেন।

আমার বাবা মুহাম্মদ আবদুল হাকিম ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। মায়ের নাম জাহানারা খাতুন। বাবার মতো মাও বহু ছাত্র-ছাত্রীকে টাকা না নিয়ে পড়িয়েছেন। তাঁরও খ্যাতি ছিল। এলাকায় প্রচলিত ধারণা ছিল, বাবার কাছে পড়লে পরীক্ষার ফল ভালো হয়, অনেক কিছু জানা যায়, সর্বোপরি নানা রকমের উপদেশ পাওয়া যায়, যেগুলো জীবনে বড় হতে কাজে লাগে।

আপনার শৈশব কেমন কেটেছে?

আমি ক্লাস সিক্স পর্যন্ত গ্রামের বাড়িতে ছিলাম। ক্লাস সিক্সে ঢাকা রেঞ্জে ফার্স্ট হয়ে বৃত্তি পাই। ক্লাস ফাইভেও প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় ঢাকা রেঞ্জে ফার্স্ট হয়েছিলাম। ভালো ছাত্র বলে সুনাম ছিল। মা-বাবার খুব আগ্রহ ছিল যেন পরীক্ষার ফল ভালো করি এবং জীবনে বড় কিছু হই। ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় মা-বাবা চিন্তা করলেন একটা ভালো স্কুলে ভর্তি করাতে হবে। ফলে আমাকে ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হলো। জিলা স্কুলে খুব আনন্দময় পরিবেশ ছিল। স্কুলের হোস্টেলে থাকতাম। লেখাপড়ায় মোটামুটি মনোযোগী ছিলাম। পাঠ্য বইয়ের বাইরে অনেক বই পড়তাম। কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই জিলা স্কুলে পড়ার সময়ই পড়ি। কয়েকজন শিক্ষক ছিলেন, যাঁরা আমাকে খুব স্নেহ করতেন। হেডমাস্টার ছিলেন মুজিবুল হক। তিনি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মেয়ের জামাই। বিলেতফেরত ছিলেন। চেহারা খুব সুন্দর ছিল। সব সময় খুব ভালো পোশাক পরে থাকতেন। সর্বোপরি কথাবার্তার মধ্যে একটা অসাধারণ সৌন্দর্য ছিল। তাঁর একটা চেষ্টা ছিল ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের ছাত্রদের মধ্য থেকে নানা ক্ষেত্রে যোগ্যতাসম্পন্ন লোক তৈরি হোক, বড় রাজনীতিবিদ হোক, লেখক হোক। আমি তখন স্কুল ম্যাগাজিনের জন্য লিখি। আমার তখনকার আগ্রহ ছিল জীবনদর্শন, সৌন্দর্য, প্রেম, প্রকৃতি—এসব বিষয়ে।

আমি বাবার প্রভাবে ‘প্রভাত-চিন্তা,’ ‘নিভৃত চিন্তা’, ‘নিশীথ চিন্তা’—এসব বই স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এবং পরবর্তী সময়ও পড়েছি। আমার মধ্যে এই যে চিন্তাশীলতা, তার শুরু ওই সব বই পড়ে। ক্লাস নাইনে পড়ার সময় মোহাম্মদ বরকতুল্লাহর ‘মানুষের ধর্ম’ বইটা পড়ি। এই বইয়ের চিন্তাও আমাকে খুব প্রভাবিত করে। তা ছাড়া শরত্চন্দ্রের উপন্যাস পড়েছি। একই সময়ে জসীমউদ্দীনের ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’, ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’, ‘কবর’—এগুলো খুব একাত্ম হয়ে পড়েছি। রবীন্দ্রনাথের ‘সঞ্চয়িতা’ স্কুলে পড়ার সময় আমার কাছে ছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস, অন্য লেখাও কিছু পড়েছি। বঙ্কিমচন্দ্রের দ্বারাও আমি খুব প্রভাবিত হয়েছি। মানুষ সম্পর্কে, মানবতা ও জীবনদর্শন সম্পর্কে অসাধারণ মূল্যবান সব কথা বঙ্কিমে আছে। বঙ্কিম যবনবিরোধী সেটা লক্ষ করেছি। তা আমার কাছে অনুচিত মনে হয়নি। বঙ্কিম যবন বলতে ভারতে বিদেশি শাসকদের নিন্দা করেছেন। আমি মনে করি এটা বিদেশি শাসক বলেই নিন্দা করেছেন, তারা ধর্মে মুসলমান বলে নন। তিনি জাতীয়তাবাদী চিন্তা করেছেন। জাতীয়তাবাদের প্রয়োজনে হিন্দু ধর্মের কথা বলেছেন। এই হিন্দু ধর্মের পাশাপাশি বাংলা হিন্দু-মুসলমানের দেশ। এখানে সকলে মিলেমিশে বসবাস করবেন এমন চিন্তাও বঙ্কিম করেছেন।

ছাত্রজীবনেই ভাষা আন্দোলনের মিছিলে গিয়েছিলেন?

জীবনে প্রথম মিছিলে যাই ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। তখন আমি পাকুন্দিয়া প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র। প্রাইমারি স্কুলের সঙ্গেই ছিল নিউ স্কিম হাই মাদরাসা, ক্লাস সিক্স থেকে। স্কুলের বিরাট মাঠের এক কোণে একটা জামগাছ ছিল। সেদিন স্কুলে গিয়ে দেখি, ক্লাস না করে সেটার তলায় সবাই জড়ো হয়েছে। সেখানে শুনলাম, নূরুল আমীনের পুলিশ গুলি করে ছাত্র হত্যা করেছে। এর প্রতিবাদে আমরা ক্লাস করব না বলে সিদ্ধান্ত হয়। আমরা সেখানেই ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘নূরুল আমীনের কল্লা চাই; মুসলিম লীগ মুসলিম লীগ, ধ্বংস হোক ধ্বংস হোক; পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিতে থাকি। এটাই আমার জীবনের প্রথম স্লোগান। ওই দিনই প্রথম মিছিলে যাই। পাকিস্তান জিন্দাবাদ—এই স্লোগান তখন সবাই দিতেন। কারণ পাকিস্তান ভেঙে ফেলব—এই ধারণা তখনো আসেনি। ১৯৫৬ সালে ব্রিটিশরা সুয়েজখাল দখল করে নিল। এর বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হয়েছিল, ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের ছাত্র হিসেবে আমরা এতে অংশ নিই। তখন ঢাকায় ব্রিটিশ কাউন্সিল পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকেই ম্যাট্রিক পাস করি।

আনন্দমোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছেন?

আনন্দমোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করি। তবে ঢাকা কলেজে দুই বছর লেখাপড়া করেছিলাম। অসুস্থতার কারণে আমি আইএসসি পরীক্ষা দিতে পারিনি। ঢাকা কলেজে রি-অ্যাডমিশন নেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। ফলে আনন্দমোহন কলেজে ভর্তি হয়ে আইএসসি পরীক্ষা দিই।

একসময় মার্ক্সবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন?

এই ধারার সঙ্গে আমি ছাত্রজীবন এবং ছাত্রজীবনের পরেও কয়েক বছর যুক্ত ছিলাম। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের পর এ ধারার সব রকমের সাংগঠনিক সংযোগ ত্যাগ করেছি। সাংগঠনিক সংযোগ ত্যাগ করলেও এসব বিষয়ে পড়ালেখা অব্যাহত রাখি। ১৯৯১ সালের ৩০ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায়। এটা আমাদের কাছে মানসিক বেদনার কারণ হয়।

আপনার সাংগঠনিক সংযোগ ত্যাগ করার কারণ?

কারণ হচ্ছে আমি যে ধারায় ছিলাম, সেই ধারায় কমরেড আবদুল হক, কাজী জাফর আহমদ, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনো, কমরেড আলাউদ্দিন আহমেদ, আবদুল মতিন, দেবেন শিকদার, আবুল বাশার—এঁরা তখন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। তারা তখন কেবল দল ভাঙছেন, আর ভাঙছেন। তাদের প্রত্যেকটা গ্রুপ দাবি করছে, তারাই সাচ্চা আদর্শের অনুসারী, বাকি সবাই আদর্শের নামে ভণ্ডামি শুরু করেছে। লক্ষ্য করলাম কোনো গ্রুপের বক্তব্যই এই দেশের জন্য বাস্তবসম্মত নয় এবং তাদের সততারও অভাবও আছে। এরা আদর্শের কথা বলে, কিন্তু প্রত্যেকটা গ্রুপ নিজেকে একেকজন মাও সেতুং মনে করে, লেনিন মনে করে। যেখানে নেতৃত্বের প্রশ্নে কেউই আপোস করতে রাজি না, এত কাড়াকাড়ি মারামারি করেন, তাদের দিয়ে হবে না। এই দুটাই মূল কারণ আমার সাংগঠনিক সংযোগ ত্যাগ করার।

আপনি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন, একটা গণজাগরণের সময় পার করেছে দেশ। কেমন ছিল সময়টা?

গণজাগরণটা বলা যায় বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন থেকেই শুরু হয়। সমগ্র ব্রিটিশ-ভারত নড়ে ওঠে। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়ে যায়। যে গণজাগরণ ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আরম্ভ হয়েছিল, সেটা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শেষ হয়নি। সোহরাওয়ার্দী বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরোধী ছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনেরও বিরোধী ছিলেন। তখন শেখ সাহেবরা এই নিয়ে আওয়ামী লীগ থেকে কথা বলতেন। কিন্তু যখনই সোহরাওয়ার্দী মারা গেলেন, শেখ মুজিব অল্প দিনের মধ্যেই ছয় দফা নিয়ে এলেন। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান ঘটল। ষাটের দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রমাগত আন্দোলন ছিল। তখন আন্দোলনের মহত্ লক্ষ্য ছিল। সেই রকম মহান এখন নেই। রাজনীতির অবলম্বন এখন সুবিধাবাদ, মুনাফেকি, হুজুগ সৃষ্টি, ভাঁওতা, প্রতারণা, সম্পত্তিলিপ্সা। জনচেতনাও এখন নিম্নগামী। ষাটের দশকের সব আন্দোলনেই আমি ছিলাম।

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে কোন শিক্ষকরা আপনার জীবনে বিশেষ প্রভাব রেখেছেন?

অধ্যাপক আহমদ শরীফ, অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবু মাহমুদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিত্সাকেন্দ্রের ডা. মোহাম্মদ মুর্তজা—এই তিনজন নানাভাবে আমার জীবনে প্রভাব বিস্তার করেন। তখন শিক্ষকদের মধ্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম স্পিরিট ছিল। আহমদ শরীফ ক্লাসে পড়াতেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস—প্রাচীন ও মধ্যযুগ। খুব আবেগ এবং আগ্রহের সঙ্গে পড়াতেন। আমি অনুভব করতাম, বাঙালির ইতিহাস পড়াতে গিয়ে এই যে বাঙালি দীর্ঘকাল তুর্কি, পাঠান, মোগলদের দ্বারা শাসিত হয়েছে, এটাকে তিনি বাঙালির পরাধীনতা মনে করতেন। বাঙালি ঈর্ষাপরায়ণ, পরশ্রীকাতর, ঐক্যবদ্ধ হতে পারে না, মহান কোনো লক্ষ্য নিয়ে চলতে পারে না—এগুলো তিনি বেশ গুরুত্ব দিয়ে বলতেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ তিনি কামনা করতেন। বাঙালির ইতিবাচক দিক নিয়ে কিছু বলতে বারবার আমি তাঁকে অনুরোধ করতাম। অর্থনীতির অধ্যাপক আবু মাহমুদ সাহেবের প্রধান আগ্রহের বিষয় ছিল সমাজতন্ত্র, মার্ক্সবাদ। এ সম্পর্কে তাঁর বইও আছে। তিনি মার্ক্সীয় বিশ্ববীক্ষা নামের আট খণ্ডের একটি বই লিখেছিলেন। তাঁর মধ্যে একখণ্ড বাংলা একাডেমি বের করেছিল, বাকি সাত খণ্ডের পাণ্ডুলিপি হয়তো খোঁজ করলে পাওয়া যেতে পারে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ সম্পর্কেও তাঁর বক্তব্য ছিল। এদিকটায় ড. আবু মাহমুদের কাছ থেকে জানার, শেখার অনেক কিছু পেয়েছি। রেগুলার তাঁর বাসায় যেতাম, আড্ডা হতো। অধ্যাপক আহমদ শরীফের বাসায়ও রেগুলার আড্ডা হতো। আড্ডায় গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো।

ডা. মুর্তজার সঙ্গে আপনার সংযোগ হয়েছিল কিভাবে?

জন্ডিস হওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাসপাতালে ভর্তি হয়ে পুরো এক মাস ছিলাম। তখন ড. মুর্তজা প্রতিদিন হাসপাতালে আমাকে দেখতে যেতেন। এটা-ওটা জিজ্ঞেস করতেন। চিকিত্সার পর একদিন তিনি নিজে হলে (এস এম হল) এলেন আমার রুমে। বললেন, ‘তোমার সঙ্গে আমার আলাপ আছে, মেডিক্যাল সেন্টারে এসো।’ গেলাম। আমি ছাত্র ইউনিয়ন করি শুনে তিনি বেশ খুশি হলেন। প্রায়ই সন্ধ্যায় তাঁর বাসায় যেতাম। আরো কিছু ছাত্রের সঙ্গেও তাঁর আলাপ ছিল। তাদের নিয়ে সপ্তাহে পাঁচ দিন সন্ধ্যার পর তাঁর বাসায় ক্লাস নিতেন। তিনি চিকিত্সক ছিলেন বটে, প্রকৃতপক্ষে তিনি শিক্ষক ছিলেন ও রাজনীতি বিষয়ে ক্লাস নিতেন। তখন সময়টা ছিল গণজাগরণের সময়।

বাংলা সাহিত্যে পড়লেও আপনার লেখায় দর্শন, রাষ্ট্রনীতি নিয়ে পরিশীলিত চিন্তার ছাপ দেখা যায়?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় ভর্তি হয়েছি, অনেকটা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের উত্তাপের কারণে। বাংলা সাহিত্যে পড়াশোনা করেছি; কিন্তু আমার চিন্তা কখনো এর মধ্যে আবদ্ধ থাকেনি। গত তিন-চার দশক ধরে দেখছি বাংলাদেশে যাঁরা গল্প, কবিতা, উপন্যাস বা প্রবন্ধ লিখছেন তাঁরা এক রকম লক্ষহীন, উদ্দেশ্যহীনভাবে লিখছেন। জনপ্রিয় লেখকরা টাকার জন্য, খ্যাতির জন্য লিখছেন। যাঁরা সমাজতন্ত্রের কথা বলছেন, তাঁরা সমাজতন্ত্র কী, সমাজতন্ত্র কী নয়—সেটা বোঝার চেষ্টা করছেন না। যাঁরা গণতন্ত্রের কথা লিখছেন তাঁরা গণতন্ত্রকে জানার-বোঝার কথা চিন্তা না করে লিখছেন। এই বাস্তবতার মধ্যে আমার মনে হয়, যেটা সাহিত্য অর্থাত্ কবিতা, গল্প, উপন্যাস এগুলো এখন জীবনধারা থেকে বিচ্যুত্। এখন দর্শন, বিজ্ঞান, রাষ্ট্রনীতি—এগুলো নিয়ে বেশি চিন্তা করা দরকার। পাঠকদের মধ্যেও সচেতনতা দরকার।

মুক্তিযুদ্ধের সময় কোথায় ছিলেন?

মুক্তিযুদ্ধের সময় লালবাগে থাকতাম। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিক থেকেই আমার পরিচিত ও অপরিচিত মুক্তিযোদ্ধা যাঁরা ছিলেন তাঁদের কিছু টাকা জোগাড় করে দেওয়া ছিল আমার কাজ। এটা তখন তাঁদের জন্য খুব উপকারের বিষয় ছিল। একজনকে একবেলা ভাত খেতে দেওয়া,  সর্বোপরি কাউকে কাউকে রাতের বেলা বাসায় থাকতে দিয়েছি। বাসায় থাকতে দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকির ব্যাপার ছিল তখন। ঢাকায় তাঁরা আসতেন খোঁজখবর নিতে। যেমন শামসুজ্জোহা মানিক। মুক্তিযুদ্ধের কাজেই এসেছেন, থাকছেন এক দিন। তারপর চলে গেছেন। ছাত্র ইউনিয়ন করা, ভাসানী ন্যাপ করার ফলে রাজনৈতিক মহলে আমার পরিচিতি ছিল। পুরান ঢাকায় গাঢাকা দিয়ে থাকতাম। যে মুক্তিযোদ্ধারা আমার কাছে আসতেন, তাঁদের কেউই অসাধারণ ছিলেন না। আমার পরিচয় জেনে, আমি পুরান ঢাকায় ছিলাম বলে আমার কাছে আসতেন। আমার সহায়তা চাইতেন। তখন যেকোনো সময় আমি প্রাণ হারাতে পারতাম। আমার স্ত্রী ও শিশুসন্তান ছিল। অবস্থা তখন ভয়াবহ ছিল। দুঃখের কথা ভুলে গিয়ে সুসময়ের আশা করেছি। তারই জন্য লিখি। নানা কাজ করতে চেষ্টা করি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেছিলেন কবে?

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছি ১৯৭২ সালে, মুক্তিযুদ্ধের পর যেদিন বিশ্ববিদ্যালয় খোলে সেদিন। সেদিনই আমার চাকরি হয়, আমার অজান্তে। যদিও বাইরে থাকার কারণে আমি আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিই কয়েক দিন পর। যোগ দিতে এসে দেখি, আমাদের বিভাগীয় প্রধান হয়েছেন ড. নীলিমা ইব্রাহিম আপা। তিনি নিজের হাতে আমাকে অ্যাপয়েনমেন্ট লেটার দিলেন। ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ সালে জয়েন করেছিলাম। অবসরে যাই ২০১১ সালে।

দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন। আপনার আদর্শ শিক্ষক কারা?

প্রথমে আমার বাবার কথা বলব। বাবার শিক্ষকতা অসাধারণ ছিল। তারপর ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন মুজিবুল হক। শেষ দিকে মোহাম্মদ আবুল ফসিহ বলে আরেকজন হেডমাস্টার ছিলেন। তিনিও অসাধারণ ছিলেন। তা ছাড়া আমাদের অসাধারণ ও খ্যাতিমান শিক্ষক ছিলেন মুহাম্মদ বশরত আলী। প্রভাতচন্দ কর, এম এইচ গালিয়া, নৃপেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, আব্দুস সামাদ, আমীর উদ্দীন—এঁরা অসাধারণ ভালো শিক্ষক ছিলেন। তাঁরা আমাদের অনেক ভালো বইয়ের সন্ধান দিয়েছিলেন।

একসময় শিক্ষকের মর্যাদা নিয়ে কবিতা লেখা হতো। এখন শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক হয়। এর কারণ কী?

দেশ-কাল বদলে গেছে। শুধু শিক্ষকদের ব্যাপার নয়, সবার ব্যাপার। জাতির ভেতরে বেশির ভাগ লোক কোনো একটা আদর্শ বা ধর্ম অবলম্বন করে জীবনযাপন করতে চায়। ধর্ম বা আদর্শের অবলম্বন ছাড়া তারা অসহায় বোধ করে এবং মনে করে সমাজে ধর্ম বা আদর্শ না থাকলে লোকে মারামারি, কাটাকাটি করে মরবে। তারা আদর্শপরায়ণ লোক চায়। আর কিছু লোক আছেন যাঁরা আদর্শের কথা বলেন বটে; কিন্তু ভাবেন আদর্শ নিয়ে আমরা টাকা-পয়সা বেশি করতে পারব না, কর্তৃত্বে থাকতে পারব না। তাঁরা সুবিধাবাদী। সুবিধাবাদী লোকেরা নানা ধরনের বঞ্চনা, প্রতারণা, মুনাফেকি করে সম্পত্তি ও ক্ষমতা অর্জন করে। ঘটনাক্রমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে একদিকে আদর্শপরায়ণ লোকেরা মার্ক্সবাদ অবলম্বন করতে চেয়েছে। অন্যদিকে সুবিধাবাদীরা সুবিধাবাদী লাইনে চলে গেছে। প্রায় রাষ্ট্রে এখন সুবিধাবাদীদের রাজত্ব চলছে। শিক্ষকরাও এখন সুবিধাবাদী। তবে সব ক্ষেত্রেই বিরল ব্যতিক্রম আছে। প্রচারমাধ্যম তাদের পক্ষে নেই।

দীপন হত্যার পরেও আপনি বলেছিলেন, শুভবোধের জাগরণ ঘটুক…

দীপন হত্যার বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল গোটা জাতির স্তরে স্তরে, অশুভবুদ্ধির কর্তৃত্বের কারণে। শুভবোধের জাগরণের কথাটা আমি হঠাত্ করে বলিনি। ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিক থেকে নানাভাবে ক্রমাগত বলে আসছি। দেশে তো মৌলবাদ ছিল না, জঙ্গিবাদ ছিল না। কেন এগুলো দেখা দিল? যারা গণতন্ত্রের কথা বলেছে, তারা গণতন্ত্রকে বিনষ্ট করেছে। যারা ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেছে, তারা ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে বিনষ্ট করেছে। যারা মৌলবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে, তারা ধর্মীয় শক্তিকে উসকানি দিয়ে জাগিয়ে তুলেছে। এসব কারণে আমি অনুভব করেছি যে দেশে অশুভবুদ্ধির কর্তৃত্ব, নেতৃত্ব চলছে। অশুভ শক্তিকে পরাজিত করে শুভ শক্তিকে জয়ী করতে পারলে, ক্ষমতায় আনতে পারলে, ক্ষমতায় রাখতে পারলে মানুষের ভালো হবে। সেটাই হবে দীপন হত্যার প্রকৃত বিচার। এই অর্থেই আমি শুভবুদ্ধির উদয় হোক—এই কথা বলেছিলাম। হত্যাকারীরা তো জল্লাদ। তারা কোনো একটা পেছনের শক্তির আদেশ পালন করছে মাত্র। তাদের শাস্তি হোক। জঙ্গিবাদের হাত থেকে জাতি, রাষ্ট্রকে মুক্ত করতে চাইলে অবশ্যই শুভবুদ্ধির জাগরণ এবং শুভবুদ্ধির প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা—ওই রকম অর্থেই আমি শুভবুদ্ধির কথা বলেছি। মনে রাখতে হবে, উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদ থেকে জাতীয়তাবাদ সম্পূর্ণ ভিন্ন।

আপনি স্বদেশ চিন্তা সংঘের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশে গণমুক্তি ও রাষ্ট্রগঠনের জন্য ২৮ দফা প্রণয়ন করেছেন। এটার মূল বক্তব্য কী?

আমরা লক্ষ করেছিলাম রাজনীতিতে রাজনৈতিক চিন্তা নেই। একরকম রাজনৈতিকীকরণ চালানো হচ্ছে। সে চিন্তা থেকেই ২৮ দফা লিখেছিলাম। ২০০৫ সালের ১ জানুয়ারি এটা প্রকাশ করেছিলাম। সেই থেকে প্রতিবার ছাপার সময় বাস্তব পরিস্থিতি চিন্তা করে পরিমার্জন করি। আমি এটা রচনার সময় কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর কথা স্মরণ করেছি, যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচি স্মরণ করেছি, শেখ সাহেবের ছয় দফার কথা স্মরণ করেছি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা ঘটনার কথা স্মরণ করেছি। আমি সর্বজনীন গণতন্ত্রের কথা বলছি।

এটা তো প্রচার করছেন গত ১৬ বছর ধরে। বাস্তবায়নের আশা দেখতে পাচ্ছেন কি?

এই সময়ের মধ্যে আমাদের রাষ্ট্র, আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি—এসব দল রাজনীতি হারিয়ে শুধু কতগুলো কৌশল অবলম্বন করে চলছে। তারা চালাকি করছে। তাদের শ্রেয়বোধ নেই, আছে সুবিধাবাদ। গণতন্ত্রের ধারণা পরিত্যাগ করে তারা নির্বাচনতন্ত্র করছে। নির্বাচনও ঠিকমতো করছে না। তাই আমি সর্বজনীন গণতন্ত্রের কথা বলেছি, যাতে দলভিত্তিক আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের সরকার গঠনের কথা বলেছি। দলগুলোর প্রাপ্ত ভোট অনুযায়ী,  আনুপাতিক প্রতিনিধি দ্বারা সংসদ ও মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হবে। বিরোধী দল বলে কিছু থাকবে না। এই যে আজকে ক্যাসিনো বলছে, পাপিয়া বলে একজন, জি কে শামীম বলে একজন—এরাই তো বর্তমান রাজনীতির প্রডাক্ট (ফসল)। এই রাজনীতির মধ্যে আমাদের দেশের আপার ক্লাসের কাছ থেকে ২৮ দফার সমর্থন মিলবে বলে মনে হয় না। এর সমর্থন উচ্চ মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও শ্রমিকদের থেকে পাওয়া যাবে, কৃষকদের থেকে পাওয়া যাবে। সে ধারায় যেতে হবে। দল গঠন করতে হবে। ঘুমন্ত জনসাধারণকে জাগাতে হবে।

আপনি ১৯৮২ সাল থেকে ‘লোকায়ত’ নামে সাময়িকপত্রের সম্পাদনা করছেন

আমাদের দেশ, জাতি, জনজাগরণ নিয়ে আমি যে আশা করে আসছি, স্বপ্ন, কল্পনা এবং সম্ভাব্য উন্নত ভবিষ্যত্ চিন্তা করে আসছি, সেই লক্ষ্য নিয়েই ‘লোকায়ত’ পত্রিকা বের করেছিলাম। বছরে চার সংখ্যা হিসেবে ৩০ বছর বের করেছি। দীপন (ফয়সল আরেফিন দীপন) মারা যাওয়ার পরে আর বের করিনি। দীপন আমাকে সাহায্য করত। এখন দীপনকে কোথায় পাব। আমার আরো অনেক কাজকর্ম বন্ধ হয়ে গেছে।

কিছুদিন পর আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করব। যে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে রাষ্ট্রচিন্তক হিসেবে আপনার কি মনে হয়—আমরা কত দূর এগিয়েছি?

নানা দিক দিয়ে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। চরম দারিদ্র্য ছিল, কেটেছে। মানুষ খেতে-পরতে পারছে। সারা দুনিয়ায়ই এই উন্নতি হয়েছে। তাতে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের ভূমিকা আছে। তবে এতে রাজনীতির খুব একটা ভূমিকা আছে বলে আমি মনে করি না। যা হচ্ছে, জনসাধারণের শ্রম ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তির গুণে হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারাবাহিকতায় আমাদের অগ্রগতি নেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল মূলত রাষ্ট্রনৈতিক—রাষ্ট্রগঠন, জাতিগঠন এবং রাষ্ট্র হবে গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক ধারায় চলা। এর কোনোটার মধ্যেই বাংলাদেশ নেই। সমাজে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা অত্যন্ত খারাপ। নৌকা মার্কায় ভোট দিন—নির্বাচনের আগে বুদ্ধিজীবীরা এ কথা বলেন। তবে ভোট পাওয়ার পর তাঁরা দেশবাসীকে অভিনন্দন জানান না, কেন? তাঁরা কী রকম বুদ্ধিজীবী। তাঁরা তো ভাড়াখাটা সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবী। তাঁরা এখন বুদ্ধিজীবী বলে পরিচয় দেন না, পরিচয় দেন বিশিষ্ট নাগরিক বলে। এটাই বাস্তবতা। আমাদের হাজার বছরের ইতিহাসের প্রগতিশীল যে প্রবণতা, এখন দেশটাকে সেদিকে নিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বুঝতে হবে, অবলম্বন করতে হবে, প্রতারণার উদ্দেশ্যে নয়, জনকল্যাণের জন্য।

আপনার বই ও লেখালেখি সম্পর্কে কিছু বলবেন?

লেখার মধ্যেই আমার পরিচয়। অনেক কিছু করা দরকার। পারি না। সমাজের ভেতর থেকে সমর্থন পেলে করতে পারতাম। আমার প্রায় ১০০ বই বাজারে আছে। অনেক লেখাই বই আকারে বের করতে পারিনি। দীপন থাকলে অবশ্য কিছুটা এগোতে পারতাম। বাংলাদেশের জন্য আমার চিন্তার চেয়ে উত্কৃষ্ট চিন্তা কার আছে? আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমার চিন্তা অবলম্বন করে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের জনগণ যথার্থ উন্নতির পথে উঠতে পারবে। এত বিষয়ের মধ্যে আমার বই ও চিন্তা সম্পর্কে আপনাকে বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়। আপনাকে ধন্যবাদ।

পরীবাগ, ঢাকা, ১০ মার্চ ২০২০

অনুলিখন : জুবায়ের আহম্মেদ

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *